চট্টগ্রাম বন্দরে রহস্যের জাল: কোথায় গেল ২৫০ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ আমদানি কনটেইনার?

কন্টেইনার গায়েব

  প্রগতি ডেস্ক: দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্য এই বন্দর দিয়ে পরিবাহিত হয়। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও একাধিক সরকারি সংস্থার নজরদারির মধ্যে থাকা এই বন্দরে কাস্টমসের নজরদারিতে থাকা অন্তত ২৫০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ আমদানি কনটেইনারের অবস্থান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ ঘটনায় রাজস্ব নিরাপত্তা, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে শুল্ক ফাঁকি, পণ্যের ভুল ঘোষণা, ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানি, জাল কাগজপত্র ব্যবহার এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় এসব কনটেইনার সাধারণ নিয়মে খালাসের অনুমতি পায়নি। সেগুলোকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে বন্দরের ইয়ার্ডে সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

সম্প্রতি কাস্টমস আটকে থাকা কনটেইনারগুলোর তালিকা পুনঃযাচাই করতে গিয়ে দেখতে পায়, তালিকাভুক্ত অন্তত ২৫০টি কনটেইনারের কোনো ভৌত অবস্থান মিলছে না। বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে খোঁজাখুঁজি করেও সেগুলো পাওয়া যায়নি। এরপর বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার সূত্রপাত হয় কাস্টমসের নিলামে বিক্রি হওয়া কয়েকটি কনটেইনার নিয়ে। নিলামে বিজয়ী ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত মূল্য, শুল্ক ও অন্যান্য সরকারি ফি পরিশোধের পর কনটেইনার বুঝে নিতে বন্দরে গেলে দেখা যায়, নির্ধারিত কনটেইনার সেখানে নেই। এরপর কাস্টমস বিস্তারিত অনুসন্ধান শুরু করলে আরও শত শত কনটেইনারের হিসাব-নিকাশে অসঙ্গতি ধরা পড়ে।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের দাবি, বন্দরে কনটেইনার সংরক্ষণ, স্থান নির্ধারণ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের। তাই নিখোঁজ কনটেইনারগুলোর অবস্থান জানতে একাধিকবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রেকর্ড যাচাই ও দায় নির্ধারণে তদন্তও চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত কনটেইনারগুলোর অনেকগুলো কয়েক বছর ধরে বন্দরে পড়ে ছিল। কিছু কনটেইনারের আমদানিকারক পণ্য খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করেননি। আবার কিছু ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃত বিবরণ নিয়ে সন্দেহ থাকায় সেগুলো কায়িক পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে গিয়ে সেগুলোর অবস্থানই নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। বন্দর বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আমদানি কনটেইনার বন্দর এলাকা থেকে বের করতে কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ, শিপিং এজেন্ট, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ একাধিক ধাপের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। ফলে শত শত কনটেইনারের হদিস না পাওয়া অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা। এটি প্রশাসনিক গাফিলতি, তথ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা অথবা সংঘবদ্ধ অনিয়মের ইঙ্গিত হতে পারে।বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু রাজস্ব ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কনটেইনারে ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য, মাদক, নিষিদ্ধ দ্রব্য বা অন্যান্য সংবেদনশীল সামগ্রী থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই ঘটনাটিকে জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।

অতীতেও চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কখনও পণ্য গায়েব, কখনও কনটেইনারের অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি, আবার কখনও জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে পণ্য খালাসের ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনার পরও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। এদিকে কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজ কনটেইনারগুলোর তালিকা ডিজিটাল রেকর্ড, ইয়ার্ড রেজিস্টার এবং শিপিং নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি কোন পর্যায়ে অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে এবং কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি বা অনিয়ম রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের আস্থা ধরে রাখতে এ ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে কনটেইনার ট্র্যাকিং ব্যবস্থা আরও আধুনিক করা, নিয়মিত অডিট এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কনটেইনারগুলো হারিয়ে গেছে, নাকি রেকর্ড সংরক্ষণে ত্রুটির কারণে অবস্থান শনাক্ত করা যাচ্ছে না—সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরে একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কনটেইনারের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা সংশ্লিষ্ট সব মহলের জন্যই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post a Comment (0)

নবীনতর পূর্বতন