গ্যাস সংকট আরও তীব্র, এলএনজি সরবরাহ বন্ধে বিদ্যুৎ ও শিল্পে চাপ।

ঢাকায় ও লোডশেডিং

 নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে চলমান গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজারের মহেশখালীতে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিকেল ৫টা থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। নতুন এলএনজি কার্গো টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় মজুত থাকা এলএনজি দিয়েই এতদিন সীমিত পরিসরে সরবরাহ চালানো হচ্ছিল। মজুত প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ার পর সরবরাহ বন্ধ করতে হয়।

এর আগে গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেটির সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হলেও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। ফলে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহের ওপর সামিটের টার্মিনালের নির্ভরতা বেড়ে যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। বুধবারও সরবরাহ ছিল প্রায় ২০৩ কোটি ঘনফুট। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

মহেশখালীর দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির স্বাভাবিক সরবরাহ সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের সক্ষমতা প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট। অগ্নিকাণ্ডের পর এক্সিলারেটের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহের বড় অংশ সামিটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সামিট থেকে দিনে প্রায় ৫৬ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল।

সামিটের টার্মিনালে নতুন এলএনজি কার্গো যুক্ত করতে না পারার মূল কারণ হিসেবে সমুদ্রের বৈরী পরিস্থিতিকে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কার্গো বার্থিংয়ের জন্য নির্ধারিত নিরাপত্তা-পরামিতির তুলনায় সমুদ্রের অবস্থা অনেক বেশি উত্তাল থাকায় জাহাজকে টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে সৌদি আরামকোর সরবরাহ করা ‘আল হামরা’ নামের এলএনজি কার্গো নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্গোটি মহেশখালীর দুই টার্মিনালের কোনোটিতেই গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের প্রক্রিয়ায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দৈনিক প্রায় ৬৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে।

এর ফলে শিল্প, আবাসিক ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের সরবরাহ আরও কমেছে। এসব খাতে কয়েক সপ্তাহ আগেও যেখানে প্রায় ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো, বর্তমানে তা প্রায় ৮৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। এতে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাসাবাড়ি ও সিএনজি স্টেশনগুলোতেও চাপ বেড়েছে।

গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে রাখতে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। রাজধানী ঢাকাতেও গত বুধবার রাত থেকে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার খবর পাওয়া গেছে।

একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ—দুই সংকট একসঙ্গে চলায় কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।

মহেশখালীর এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে। কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ এমএমসিএফডি। এর বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ প্রায় ২১০ এমএমসিএফডিতে নেমে এসেছে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ১৪০ এমএমসিএফডি বা ৪০ শতাংশ।

এতে শিল্প-কারখানা, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপর চাপ বেড়েছে। সংকটের কারণে কোথাও কোথাও সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি তৈরি হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।

গত ৬ আগস্ট এক্সিলারেট এনার্জির ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল থেকে সীমিত পরিসরে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। তবে টার্মিনালটি এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরেনি। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটির পরীক্ষা ও পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগের সক্ষমতায় সরবরাহ পাওয়া কঠিন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে সামিটের টার্মিনাল থেকে শুক্রবার সরবরাহ পুনরায় শুরু হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। শুরুতে সীমিত পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করে ধাপে ধাপে তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সামগ্রিক গ্যাস সংকট পুরোপুরি কাটাতে দুই এলএনজি টার্মিনালের কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়া জরুরি।

এলএনজি আমদানিনির্ভরতার পাশাপাশি দেশে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও দীর্ঘমেয়াদে কমেছে। ২০০৯ সালে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৭৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতো। পরবর্তী সময়ে উৎপাদন বাড়লেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন আবার কমতির দিকে রয়েছে।

ফলে একদিকে দেশীয় উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের অবকাঠামো ও টার্মিনালনির্ভরতা বেড়েছে। মহেশখালীর দুটি টার্মিনালের যেকোনো একটিতে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিলেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক বড় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

সব মিলিয়ে বৈরী আবহাওয়া, এলএনজি কার্গো গ্রহণে জটিলতা এবং একটি টার্মিনালের সীমিত সক্ষমতা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপে ফেলেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে গ্যাসের জোগান বাড়ানোর কারণে শিল্প ও অন্যান্য খাতে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। পরিস্থিতি স্থায়ীভাবে স্বাভাবিক করতে এলএনজি টার্মিনালগুলোর পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরা এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো—দুই দিকেই দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post a Comment (0)

নবীনতর পূর্বতন
প্রগতি বার্তা
ব্রেকিং নিউজ
সর্বশেষ সংবাদ লোড হচ্ছে...
00:00:00

𝑷𝒓𝒐𝒈𝒂𝒕𝒊𝑩𝒂𝒓𝒕𝒂

প্রগতি বার্তা
সত্যের সন্ধানে নির্ভীক