চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিস্ফোরণ ও গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯ জনে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে ভাটিয়ারী স্টেশন রোডসংলগ্ন এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়েছেন। আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। পরে হাসপাতালে আরও মরদেহ আনা হলে নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। দুপুরে আটজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর সন্ধ্যার প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা নয়জনে পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া যায়। ফলে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দিনের বিভিন্ন সময়ে পাওয়া তথ্যের মধ্যে পার্থক্য দেখা গেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইয়ার্ডে একটি স্ক্র্যাপ জাহাজে কাজ চলছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে জাহাজটির ট্যাংক থেকে গ্যাস বের হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোথাও এটিকে স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার পর শ্রমিকদের কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। তবে বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক বক্তব্য হিসেবে কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজটির গ্যাস অপসারণ না করেই কাটাকাটির কাজ করায় দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার আগে এটিকে চূড়ান্ত কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
নিহত খোকনের চাচা ও কারখানাটির সাবেক শ্রমিক আঙ্গুর আলী বলেন, সকালে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখতে পান। বিস্ফোরণের পর শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিলেন। গ্যাসের কারণে প্রথম দিকে ভেতরে প্রবেশ করাও সম্ভব হচ্ছিল না। পরে খোকনসহ কয়েকজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
দুর্ঘটনার পর আহত ও অসুস্থ শ্রমিকদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতাল সূত্রে প্রথমে পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে আরও মরদেহ হাসপাতালে পৌঁছালে মৃতের সংখ্যা আটজনে দাঁড়ায়। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা ছিল, গ্যাসের বিষক্রিয়া ও বিস্ফোরণের কারণে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে নিহতদের মধ্যে মো. রানা, খোকন, মনছুর, নাছির ও হাবিবুর রহমানের পরিচয় পাওয়া যায়। দুর্ঘটনায় আপন দুই ভাই মনছুর ও নাছিরের মৃত্যুর ঘটনাও স্বজনদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে।
দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি) ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনার কারণ ও ইয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকারস অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আহত শ্রমিকদের চিকিৎসার বিষয়েও সহযোগিতার কথা জানানো হয়েছে।
সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনা নতুন নয়। সর্বশেষ ঘটনার পরও জাহাজ কাটার আগে গ্যাস পরীক্ষা, জাহাজটি নিরাপদ বা গ্যাসমুক্ত কি না তা যাচাই এবং শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় সামনে এসেছে।
তবে দুর্ঘটনার জন্য কারও অবহেলা বা নির্দিষ্ট কোনো কারণকে এখনই দায়ী করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত শেষ হলে বিস্ফোরণ ও গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার প্রকৃত কারণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা স্পষ্ট হবে।
একসঙ্গে কয়েকজন শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় নিহতদের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডটির কার্যক্রম বন্ধ রাখার পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসা এবং নিহতদের পরিবারের সহায়তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন