২৪-এর গণঅভ্যুত্থান: ২৩ জুলাই সরকারের প্রতি ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম।

অমর জুলাই আন্দোলন

প্রগতি ডেস্ক: সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশব্যাপী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। টানা সংঘাত, হতাহত ও গ্রেপ্তারের মধ্যেই ২৩ জুলাই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে সামনে আসে। এদিন আন্দোলনের সমন্বয়করা সরকারের প্রতি চার দফা ‘জরুরি দাবি’ বাস্তবায়নে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন এবং দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের সংলাপে না যাওয়ার ঘোষণা দেন।

২৩ জুলাই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম সরকারের প্রতি ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, চার দফা দাবি বাস্তবায়িত না হলে আন্দোলন আরও কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে দেশব্যাপী বিস্তৃত করা হবে।

চার দফা দাবি

সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীরা যে দাবিগুলো তুলে ধরেন, তার মধ্যে ছিল—

  • আন্দোলনে নিহতদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করা।

  • গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীদের নিঃশর্ত মুক্তি।

  • আহতদের চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ এবং দমন-পীড়নের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।

  • শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও হয়রানি বন্ধ করে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।

আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন, এসব দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে তারা কোনো আলোচনায় বসবেন না।

তৎকালীন সমন্বয়কদের ভূমিকা

আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা সমন্বয়কদের মধ্যে নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আবু বাকের মজুমদার, রিফাত রশিদ, উমামা ফাতেমাসহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী সামনের সারিতে থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি সমন্বয় করেন।

  • নাহিদ ইসলাম আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র হিসেবে বিভিন্ন কর্মসূচি, বিবৃতি ও সিদ্ধান্ত তুলে ধরতেন।

  • আসিফ মাহমুদ দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করা এবং আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

  • সারজিস আলম সংবাদ সম্মেলনে চার দফা দাবি ও ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম ঘোষণা করেন।

  • হাসনাত আব্দুল্লাহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, আন্দোলনকারীদের ঐক্য ধরে রাখা এবং গণমাধ্যমে আন্দোলনের অবস্থান তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

  • উমামা ফাতেমা নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ও আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি সমন্বয়ে সক্রিয় ছিলেন।

মধ্যরাতে অভিযানের অভিযোগ

২৩ জুলাই গভীর রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর অভিযোগ ওঠে। আন্দোলনকারীদের দাবি, পুলিশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকা, বিভিন্ন ছাত্রাবাস, মেস ও ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে বহু শিক্ষার্থীকে আটক করে। অনেক বাসা ঘেরাও করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।

এ সময় আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, পুলিশের অভিযানে আওয়ামী লীগের সমর্থক বা সহযোগী হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যক্তিও অংশ নেন। তবে এ অভিযোগ সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়নি। পুলিশের ভাষ্য ছিল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং নাশকতার আশঙ্কা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

আন্দোলনের নতুন মোড়

২৩ জুলাইয়ের আলটিমেটাম এবং মধ্যরাতের অভিযানের অভিযোগ আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। সংলাপের সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে যায় এবং পরবর্তী দিনগুলোতে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে এই আন্দোলনই জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ