নিজস্ব প্রতিবেদক: কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনের অদূরে গভীর সমুদ্রে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা একটি কাঠের বোট থেকে ৭৬ জনকে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য হিসেবে শনাক্ত করে আটক করা হয়েছে। বাকি ৬৫ জনকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা বলে প্রতারণার শিকার ব্যক্তি হিসেবে জানিয়েছে নৌবাহিনী।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে সেন্টমার্টিন ও তৎসংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় নিয়মিত টহলের সময় এ উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। শুক্রবার (২ অক্টোবর) আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।
নৌবাহিনী জানায়, সেন্টমার্টিন লাইটহাউস থেকে আনুমানিক ৮১ নটিক্যাল মাইল দূরে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত ট্রলার এফভি ক্রিস্টাল-১ সমুদ্রে একটি কাঠের বোটকে ভাসমান অবস্থায় দেখতে পায়। বোটটির ইঞ্জিন বিকল ছিল। পরে মাছ ধরার ট্রলারের লোকজন বোটটির কাছে গেলে সেখানে থাকা কয়েকজনের আচরণ সন্দেহজনক মনে হয়। বিষয়টি দ্রুত নৌবাহিনীকে জানানো হয়।
খবর পাওয়ার পর সেন্টমার্টিন ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত টহলে থাকা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে।
নৌবাহিনীর সদস্যরা সেখানে গিয়ে দেখতে পান, কাঠের বোটটির ইঞ্জিন ও পাম্প বিকল হয়ে গেছে। এর মধ্যে বোটের ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করায় সেটিতে থাকা ব্যক্তিদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। নৌবাহিনীর সদস্যরা দ্রুত পানি নিষ্কাশন করে বোটটিকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। এরপর বোটে থাকা ৭৬ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারের পর তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা, খাবার এবং প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে নৌবাহিনী।
নৌবাহিনীর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উদ্ধার হওয়া ৭৬ জনের মধ্যে ১১ জনকে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য হিসেবে শনাক্ত করা হয়। পরে তাদের আটক করা হয়েছে।
অপর ৬৫ জনকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা বলে প্রতারণার শিকার ব্যক্তি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তাদের অধিকাংশকে মানবপাচারকারী চক্রের মাধ্যমে অপহরণ করে কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম এলাকায় আটকে রাখা হয়েছিল। পরে তাদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে নেওয়া হচ্ছিল।
তবে এসব তথ্য প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে পাওয়া গেছে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ায় আরও তদন্ত ও যাচাই হবে।
নৌবাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে না পৌঁছালে বোটটিতে পানি ঢুকে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ইঞ্জিন ও পাম্প বিকল হওয়ার পর বোটটি সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় ছিল এবং একপর্যায়ে পানি ঢুকতে শুরু করে।
নৌবাহিনীর দ্রুত উদ্ধার তৎপরতায় পানি নিষ্কাশন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। পরে ৭৬ জনকেই নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য হিসেবে শনাক্ত ১১ জন এবং জব্দ করা বোটটি পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য টেকনাফ থানায় হস্তান্তরের কার্যক্রম চলছে বলে জানিয়েছে নৌবাহিনী।
টেকনাফ থানার কর্মকর্তারাও গভীর সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের থানায় আনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় মানবপাচার, চোরাচালানসহ বিভিন্ন ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে নৌবাহিনীর নিয়মিত টহল ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এই অভিযানের মাধ্যমে একদিকে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের আটক করা হয়েছে, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা ৭৬ জনের সম্ভাব্য প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে নৌবাহিনী।
সেন্টমার্টিনের অদূরে গভীর সমুদ্রে এভাবে বিপজ্জনক অবস্থায় থাকা বোট থেকে এতসংখ্যক মানুষ উদ্ধারের ঘটনায় সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার ঝুঁকিও আবার সামনে এসেছে। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ও অভিযান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন