ডেস্ক রিপোর্ট: রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার দুই দিন পর শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের স্বাক্ষর করা এক অফিস আদেশে তাকে ডিএমপি সদরদপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। অফিস আদেশে প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে ‘প্রশাসনিক কারণ’ উল্লেখ করা হয়েছে। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করার কথাও বলা হয়।
প্রত্যাহারের পর শনিবার মধ্যরাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করে শাহ আলী থানা ত্যাগ করেন জাহাঙ্গীর আলম। তবে ডিএমপির অফিস আদেশে তার প্রত্যাহারকে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগের কারণে করা হয়েছে—এমন কথা উল্লেখ নেই।
এর আগে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে। পরে মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, টিকা, নগদ অর্থসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়। এরপর ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার শাহ আলী থানায় মামলা করেন। মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াসহ ২০০ থেকে ২৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে। হানিফ মিয়া অবশ্য ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রথম দফায় চারজনকে গ্রেফতার করে। তারা হলেন—সোহেল (২২), জুয়েল (২৩), জিহাদ হাসান (২১) ও রাব্বি (২০)। শাহ আলী থানার তৎকালীন ওসি জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছিলেন, শুক্রবার রাতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয় এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হামলায় নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেফতার ব্যক্তিরা অর্থের বিনিময়ে হামলায় অংশ নেওয়ার কথা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছেন। তবে তাদের এই বক্তব্য তদন্তাধীন এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ডিএমপি জানিয়েছে, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে লুট হওয়া দুই ট্রাক মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে হামলার সময় ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি এবং ঘটনাটি ঠেকাতে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশের কোনো অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কোনো পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা বা দায়িত্ব পালনে গাফিলতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমও স্বীকার করেছিলেন যে হামলা ও ভাঙচুরের সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত ছিল। তবে হামলাকারীদের তখনই কেন আটক করা হয়নি বা হামলা বন্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা কেন নেওয়া যায়নি, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি দীর্ঘদিন ধরে মিরপুর এলাকার সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের মধ্যে শিশুদের টিকাদান, মাতৃ ও শিশুসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা রয়েছে।
এ ঘটনায় একদিকে হামলাকারীদের গ্রেফতার ও লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারের অভিযান চলছে, অন্যদিকে হামলার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি কাজ করছে। এর মধ্যেই শাহ আলী থানার ওসিকে ‘প্রশাসনিক কারণে’ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। তবে এই প্রত্যাহারকে তদন্তে তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এ বিষয়ে ডিএমপির অফিস আদেশে এমন কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন