নিজস্ব প্রতিনিধিঃ পাবনা সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের কুলুনিয়া গ্রামে ১০ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষার্থী কামরুন্নাহার কলিকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত মো. মোস্তফা কামালের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুলুনিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হলেও বিপুলসংখ্যক মানুষের ক্ষোভের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙচুর ঠেকানো সম্ভব হয়নি। তবে অভিযুক্তের পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। হামলায় কেউ আহত হয়নি বলে জানিয়েছেন পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম।
যেভাবে ভাঙচুরের ঘটনা
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, শিশু কলিকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে মোস্তফা কামাল ও ইয়াছিন আলীকে গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিক্ষুব্ধ লোকজন মোস্তফা কামালের বাড়ির সামনে জড়ো হন।
একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা বাড়িতে হামলা চালিয়ে বিভিন্ন অংশ ও মালামাল ভাঙচুর করে। কিছু প্রতিবেদনে মূল ফটক ও সীমানাপ্রাচীরসহ বাড়ির বিভিন্ন অংশে ব্যাপক ভাঙচুরের কথা বলা হয়েছে।
পাবনা সদর থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ আগে থেকেই উপস্থিত ছিল। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষের তুলনায় পুলিশের সদস্যসংখ্যা কম থাকায় শুরুতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ওসি জানান, উত্তেজিত জনতা বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলে পুলিশ দ্রুত অভিযুক্তের পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। একই সঙ্গে বাড়ির কিছু মূল্যবান মালামালও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনায় কোনো ব্যক্তি আহত হননি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সাত দিন পর উদ্ধার হয় শিশুর মরদেহ
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কুলুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা কামাল প্রামাণিকের ১০ বছর বয়সী মেয়ে কামরুন্নাহার কলি নিখোঁজ হয়। সে স্থানীয় আল ফালাহ একাডেমির চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা বিভিন্ন স্থানে তার সন্ধান করতে থাকেন। পরে গত ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে বাড়ির পাশের একটি জলাশয়/ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহ উদ্ধারের পর শিশুটির বাবা কামাল প্রামাণিক বাদী হয়ে পাবনা সদর থানায় মামলা করেন। এরপর তদন্তে স্থানীয় মুদি দোকানি মোস্তফা কামাল ও একই এলাকার ভাড়াটিয়া ইয়াছিন আলীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্যে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) পাবনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ৯ সেপ্টেম্বর শিশুটিকে মোস্তফা কামালের দোকানের পেছনের একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর মরদেহ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে প্রথমে ঘরের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়। পরে রাতে সেটি পাশের একটি জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়। তদন্তে মোবাইল ফোনের ডিজিটাল তথ্য ও ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামতও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তবে এসব তথ্য বর্তমানে পুলিশের তদন্ত ও আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের অংশ। আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে।
গ্রেফতার দুইজন
এ ঘটনায় গ্রেফতার মোস্তফা কামালের বয়স ৫৫ বছর। তিনি কুলুনিয়া এলাকার বাসিন্দা ও স্থানীয় মুদি দোকানি। অপর গ্রেপ্তার ইয়াছিন আলী একই এলাকায় ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর বয়স ২১ থেকে ২৫ বছর উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে এই ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এলাকায় শোক ও ক্ষোভ
শিশু কলির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কুলুনিয়া ও আশপাশের এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, পুলিশ সাধারণ মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ধারণ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বর্তমানে কুলুনিয়া এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। শিশুটির হত্যাকাণ্ডের তদন্তও অব্যাহত রয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন