নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যে আগে থেকেই চাপে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর পর রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে রাইডশেয়ারিং সেবাতেও অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়ার কথা জানিয়েছেন যাত্রীরা।
তবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরপরই অধিকাংশ নিত্যপণ্যের খুচরা দামে বড় ধরনের পরিবর্তন এখনো দেখা যায়নি। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়ার প্রভাব ধীরে ধীরে পণ্যের দামে পড়তে পারে। বিশেষ করে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে রাজধানী ও বড় শহরের বাজারে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হলে সামনে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়।
নতুন দরে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের তুলনায় প্রতিটি জ্বালানি তেলের দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা বেড়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও জাহাজভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি তেলের দামের ব্যবধানও মূল্য সমন্বয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প ছিল না। তিনি জানান, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির বড় অঙ্কের লোকসান হয়েছে।
নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পরদিনই রাজধানীর বিভিন্ন রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার কিছু রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও নতুন ভাড়ার সরকারি সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়াকে কেন্দ্র করে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়েছে।
তবে একই সময়ে রাজধানীর অধিকাংশ বাসে পুরোনো নির্ধারিত ভাড়াতেই যাত্রী পরিবহন করতে দেখা গেছে। পরিবহন শ্রমিকদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, নতুন ভাড়ার চার্ট না আসায় তারা আগের ভাড়াই নিচ্ছেন। আবার কিছু বাসে প্রতি স্টপেজে ৫ টাকা করে বাড়তি ভাড়া চাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সঙ্গে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বৈঠকও হয়েছে। সেখানে জ্বালানি খরচ ও পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় ভাড়া সমন্বয়ের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
রাজধানীর পাশাপাশি চট্টগ্রামেও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব গণপরিবহনে দেখা গেছে।
স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নগরের বিভিন্ন রুটে বাস, টেম্পু, লেগুনা ও রাইডশেয়ারিং সেবায় আগের তুলনায় বাড়তি ভাড়া চাওয়া হয়েছে। আগ্রাবাদ থেকে জামালখান রুটে ডিজেলচালিত টেম্পুর ভাড়া ২০ টাকা থাকলেও ৫ টাকা বাড়িয়ে ২৫ টাকা দাবি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার জিইসি মোড় থেকে নতুন সেতু পর্যন্ত ২৫ টাকার ভাড়ার জায়গায় ৩০ টাকা চাওয়ার তথ্যও এসেছে।
বাড়তি ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন স্থানে যাত্রী ও চালকদের মধ্যে কথা-কাটাকাটির ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চালকদের ভাষ্য, নতুন দামে জ্বালানি কিনে আগের ভাড়ায় গাড়ি চালালে তাদের পরিচালন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে পণ্য পরিবহন খরচে। ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের ভাষ্য, ট্রাকসহ পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া বাড়লে সেই অতিরিক্ত অর্থ শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, একটি পণ্য উৎপাদন বা সংগ্রহের পর তা ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত একাধিক ধাপে পরিবহন করতে হয়। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে প্রতিটি ধাপেই পরিবহন খরচ বাড়তে পারে। ফলে কৃষিপণ্য, সবজি, মাছ, মাংস, চাল, ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একজন আড়তদারের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাকভাড়া যদি কয়েক হাজার টাকা বাড়ে, সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামের ওপর পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু বাজারে পণ্য পরিবহনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষিতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের কৃষিতে সেচ, জমি চাষ, ফসল পরিবহন ও বিভিন্ন যান্ত্রিক কাজে ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। সেই বাড়তি খরচ পরবর্তী সময়ে কৃষিপণ্যের বাজারদরে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির সময় ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হলে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্প খাতের ব্যবসায়ীরাও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধিতে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়ার আশঙ্কা জানিয়েছেন।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে রাইডশেয়ারিং খাতেও। বাইক ও গাড়িতে রাইড দেওয়া চালকদের জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের আয় ও পরিচালন ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে যাত্রীদের ক্ষেত্রেও রাইডের খরচ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বেশি ভাড়া হলে অনেক যাত্রী রাইডশেয়ারিংয়ের পরিবর্তে তুলনামূলক কম খরচের পরিবহন বেছে নিতে পারেন—এমন আশঙ্কাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন দাম কার্যকর হওয়ার আগে পুরোনো দামে জ্বালানি নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গ্রাহকদের ভিড় দেখা যায়। কোথাও কোথাও সরবরাহ বন্ধ বা কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে নতুন দাম ঘোষণার পর তেল বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। এতে অনেক গ্রাহক জ্বালানি না পেয়ে ফিরে যান।
রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানের পাম্পেও রাতের দিকে গ্রাহকদের সঙ্গে কর্মীদের বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। কিছু ঘটনায় পরিস্থিতি হাতাহাতি ও মারামারি পর্যন্ত গড়ায় বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পূর্ণ প্রভাব বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও পরিবহন, কৃষি, উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় বাড়তি ব্যয়ের কারণে পরবর্তী সময়ে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় উপাদান হওয়ায় পরিবহন খরচ বাড়লে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ব্যয়ও বাড়তে পারে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব একাধিক পর্যায় পেরিয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পারে।
এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—আয় না বাড়লেও যাতায়াত, পণ্য পরিবহন এবং দৈনন্দিন বাজার খরচ বাড়তে পারে। ফলে বর্তমানে স্থিতিশীল থাকা কিছু পণ্যের দামও সামনে বাড়বে কি না, সেটিই এখন ভোক্তাদের বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন