নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
কর্মস্থলে দীর্ঘদিন অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিত থাকা, ছুটি শেষে দায়িত্বে যোগ না দেওয়া এবং চাকরি থেকে পলায়নের অভিযোগ বিভাগীয় তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আসাদুজ্জামানসহ পুলিশের ছয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সরকার।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনগুলোতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর স্বাক্ষর রয়েছে।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও তদন্ত করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাদের চাকরি থেকে বরখাস্তের মতো গুরুদণ্ড দেওয়া হয়।
বরখাস্ত হওয়া ছয় কর্মকর্তা
সরকারের আদেশে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন—
১. ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান
২. সিরাজগঞ্জের সাবেক পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল
৩. সচিবালয় নিরাপত্তা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার রাজীব দাস
৪. সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জায়েদুল আলম
৫. অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) সাবেক পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন
৬. সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পলাশ রঞ্জন দে।
মো. আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ
প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, মো. আসাদুজ্জামান ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, সারদায় সংযুক্ত ছিলেন। তিনি ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সেখানে যোগ দেন। একই দিন থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছুটি নিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করেন।
তবে ছুটি শেষ হওয়ার পর তিনি আর কর্মস্থলে যোগ দেননি এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই অনুপস্থিত থাকেন। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে চাকরি থেকে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে বরখাস্ত করা হয়। তার বরখাস্তের আদেশ ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর করা হয়েছে।
মোহাম্মদ জায়েদুল আলম
সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জায়েদুল আলম ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর থেকে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন।
এর আগে তিনি চিকিৎসার জন্য ছুটি নিয়ে ১২ অক্টোবর থাইল্যান্ড যাওয়ার উদ্দেশ্যে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। ছুটি শেষ হলেও তিনি আর দায়িত্বে ফেরেননি।
এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর থেকে তার বরখাস্তের আদেশ কার্যকর করা হয়।
রাজীব দাস
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সচিবালয় নিরাপত্তা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার রাজীব দাস ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর চিকিৎসার জন্য ২০ দিনের ছুটিতে থাইল্যান্ড যান।
ছুটি শেষে ২ নভেম্বর তার কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি আর কর্মস্থলে ফেরেননি।
এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৪ সালের ২ নভেম্বর থেকে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
আরিফুর রহমান মণ্ডল
সিরাজগঞ্জের সাবেক পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন।
তার সঙ্গে ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ ও ঠিকানায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে প্রজ্ঞাপনভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন
অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) সাবেক পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন।
তিনি দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
পলাশ রঞ্জন দে
এপিবিএনের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং সুপারনিউমারারি পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত পলাশ রঞ্জন দে ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট থেকে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন।
তার ব্যক্তিগত ও সরকারি মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল বলেও প্রজ্ঞাপনভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি জবাব দেননি।
পরে ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট থেকে তার বরখাস্তের আদেশ কার্যকর করা হয়।
বিধি অনুযায়ী গুরুদণ্ড
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনগুলোতে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর চাকরি থেকে বরখাস্তের মতো গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট আদেশ কার্যকর করা হয়।
সরকারি আদেশ অনুযায়ী, প্রত্যেক কর্মকর্তার বরখাস্তের কার্যকর তারিখ সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রজ্ঞাপন জারি হলেও কয়েকজনের ক্ষেত্রে বরখাস্তের আদেশ পূর্ববর্তী তারিখ থেকে কার্যকর করা হয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন