নিজস্ব প্রতিবেদক:
নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে বেসরকারি খাতের উদ্যোগে মোট ৯১৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ২০২৮ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ইতোমধ্যে ১২টি স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা আইপিপির সঙ্গে এসব সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চুক্তি করেছে। প্রকল্পগুলোর বিদ্যুতের গড় ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৯ টাকা ১২ পয়সা, যা আগের কয়েকটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের তুলনায় কম।
বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিবদ্ধ ১২টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ২০০ মেগাওয়াটের প্রকল্পটি চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে নির্মাণ করা হবে।
এ ছাড়া পাবনার ঈশ্বরদীতে ১৫০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। কক্সবাজারে দুটি ১০০ মেগাওয়াটের প্রকল্প এবং বাগেরহাটের মোংলায় আরও একটি ১০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
পাবনার ঈশ্বরদীতে আরও ৭০ মেগাওয়াটের একটি প্রকল্প থাকবে। বাকি প্রকল্পগুলো মৌলভীবাজারের বিবিয়ানা, নীলফামারীর জলঢাকা, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী, মৌলভীবাজার সদর এবং নোয়াখালীর সুধারামে স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রকল্পের সক্ষমতা ১০ থেকে ৫০ মেগাওয়াটের মধ্যে।
প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে এসব প্রকল্পের জন্য বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। গড় ট্যারিফ প্রতি ইউনিট ৭ দশমিক ৮০ মার্কিন সেন্ট, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯ টাকা ১২ পয়সা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আগের চুক্তিগুলোর তুলনায় এই হার প্রায় আড়াই সেন্ট কম।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১২টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সরকারি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা ৯১৮ মেগাওয়াট এবং দীর্ঘমেয়াদে এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
শুধু বেসরকারি খাত নয়, বিপিডিবি নিজস্ব অর্থায়নেও ৬৮৯ মেগাওয়াট গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব প্রকল্প ২০৩০ সালের মধ্যে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি ফেনীর সোনাগাজীতে ২২২ মেগাওয়াটের গ্রিড-সংযুক্ত সৌর ফটোভোলটাইক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
রামপালেও ৪৪২ মেগাওয়াটের একটি গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বিদ্যমান রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে প্রায় ৯১৮ দশমিক ৫ একর অব্যবহৃত জমিতে স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিপিডিবি সরকারি বিভিন্ন ভবন ও স্থাপনায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাও সম্প্রসারণ করছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিজস্ব অর্থায়নে ৬৮৮ কিলোওয়াট-পিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৪ হাজার ১৯৫ কিলোওয়াট-পিক সক্ষমতা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে সরকার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজও ঘোষণা করেছে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য উৎসের অংশ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রচলিত ও আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমানো।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল ২০২৬-২০৩০ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রাউন্ড-মাউন্টেড সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন