নিজস্ব প্রতিবেদক: গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। এর অংশ হিসেবে খেলাপি ও অনাদায়ী বিনিয়োগ দ্রুত আদায় ও পুনরুদ্ধারে বিশেষ ‘কালেকশন অ্যান্ড রিকভারি ওয়ার রুম’ চালু করেছে ব্যাংকটি। পাশাপাশি আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী আমানতের মূল অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক করার বিষয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী শায়রুল হাসান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবেদুর রহমান সিকদারের বৈঠকের পর এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি আমানতকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী আল-ওয়াদিয়াহ চলতি হিসাব, মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাব ও মুদারাবা মেয়াদি আমানতের মূল অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। ইতোমধ্যে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর ঘোষিত স্কিম অনুযায়ী আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।
এ ছাড়া আমানতকারীদের মুনাফার ওপর কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ বা কাটছাঁট করা হবে না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। গ্রাহকদের মধ্যে এ বিষয়ে থাকা বিভ্রান্তি দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানাতে নির্দেশ দিয়েছে।
ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে খেলাপি ও অনাদায়ী বিনিয়োগ আদায়ে। এ লক্ষ্যে ১৬ আগস্ট সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের করপোরেট হেড অফিসে বিশেষ ‘কালেকশন অ্যান্ড রিকভারি ওয়ার রুম’-এর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন করেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবেদুর রহমান সিকদার।
নতুন এই ওয়ার রুমের মাধ্যমে বিনিয়োগ আদায় ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয়, পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করা হবে। বড় বিনিয়োগগ্রহীতাদের বিষয়ে নিবিড় নজরদারি ও নিয়মিত ফলোআপের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছেন, কালেকশন ও রিকভারি কার্যক্রমকে শুধু নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম হিসেবে দেখলে হবে না; এটি আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং ব্যাংকের আর্থিক পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। দ্রুত ও কার্যকরভাবে খেলাপি বিনিয়োগ আদায় করা গেলে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ও তারল্য পরিস্থিতি শক্তিশালী হবে এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়বে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠিত হয়েছে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক—একীভূত করে। এসব ব্যাংকের সম্পদ ও দায় হস্তান্তরের মাধ্যমে নতুন ব্যাংকটি গঠন করা হয়েছে।
ব্যাংকটির মূলধন কাঠামো গড়ে তুলতে সরকারের পক্ষ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং আমানতকারীদের পক্ষ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা—মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন কাঠামো গড়ে তোলার কথা জানানো হয়েছে।
একীভূত হওয়ার পর ব্যাংকটির সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিপুল খেলাপি ও অনাদায়ী বিনিয়োগ দ্রুত পুনরুদ্ধার করা। ফলে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি শক্তিশালী করতে রিকভারি কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে গ্রাহকসেবা স্বাভাবিক করা, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা। ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে এ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
খেলাপি বিনিয়োগ আদায়, তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রাহকসেবা স্বাভাবিক করার মাধ্যমে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে চায়। এখন এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকদের আস্থা কত দ্রুত ফিরে আসে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন