প্রগতি বার্তা | বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল থেকে এবার তৈরি হচ্ছে বিস্কুট! অবাক করার মতো হলেও যুক্তরাষ্ট্রের Southern Illinois University Carbondale (SIU Carbondale)-এর গবেষকেরা এমন একটি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যেখানে প্লাস্টিক বর্জ্য ও কৃষিজ বর্জ্যকে বিশেষ ধরনের ইস্ট বা ছত্রাকের মাধ্যমে খাদ্য উপাদানে রূপান্তর করে 3D প্রিন্টারে বিস্কুট তৈরি করা হচ্ছে। গবেষণাটি ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানে নভোচারীদের খাবারের নতুন উৎস তৈরির সম্ভাবনাও দেখাচ্ছে।
গবেষকদের পদ্ধতিতে সাধারণ পানির বোতলে ব্যবহৃত পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট (PET) প্লাস্টিক ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রথমে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের মাধ্যমে পানি ও অক্সিজেন ব্যবহার করে PET ভেঙে ছোট কার্বনসমৃদ্ধ অণুতে পরিণত করা হয়।
এরপর বিশেষভাবে পরিবর্তিত বা প্রোগ্রাম করা ইস্টকে ওই কার্বনসমৃদ্ধ উপাদান খাওয়ানো হয়। ইস্ট সেই উপাদানকে ব্যবহার করে প্রোটিন, চর্বি, অ্যাসিড, ভিটামিনসহ বিভিন্ন জৈব উপাদান তৈরি করে। এসব উপাদানকে অন্যান্য খাদ্য উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে খাবারের উপযোগী মিশ্রণ তৈরি করা হয়।
গবেষকেরা তৈরি করা খাদ্য মিশ্রণকে 3D প্রিন্টারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট আকৃতি ও নকশায় তৈরি করছেন। ফলে প্রচলিত বিস্কুটের পাশাপাশি বিভিন্ন জ্যামিতিক বা থ্রিডি নকশার বিস্কুটও বানানো সম্ভব হচ্ছে।
গবেষণা প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা এসব পণ্যকে “µBites” বা “Microbites” নামে উল্লেখ করেছেন। প্রযুক্তিটির লক্ষ্য শুধু আকর্ষণীয় খাবার তৈরি করা নয়; বরং বর্জ্যকে খাদ্য উৎপাদনের কাঁচামালে পরিণত করা।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই প্লাস্টিক-উৎস থেকে তৈরি বিস্কুট এখনো মানুষের খাওয়ার জন্য অনুমোদিত হয়নি। গবেষকেরা জানিয়েছেন, মানবদেহে খাওয়ার পরীক্ষা চালানোর আগে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া হচ্ছে।
গবেষকেরা এখন পর্যন্ত বিস্কুটের গন্ধ বা aroma নিয়ে মূল্যায়ন করেছেন এবং সেখান থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন। তাই এটিকে এখনই বাজারে পাওয়া বা মানুষের জন্য নিরাপদ খাবার হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
এই প্রযুক্তির পেছনে অন্যতম বড় লক্ষ্য হলো দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযান। গবেষণাটি NASA-এর Deep Space Food Challenge-এর অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত।
মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর মতো দীর্ঘ অভিযানে পর্যাপ্ত খাবার সঙ্গে নিয়ে যাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে মহাকাশযানের ভেতরে বর্জ্য বা সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে খাদ্য উপাদান তৈরির প্রযুক্তি তৈরি করা গেলে দীর্ঘ অভিযানে খাবারের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, মঙ্গল অভিযানের যাত্রা কয়েক বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। এ ধরনের অভিযানে মহাকাশযানের প্রতিটি সম্পদ максимально কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গা থেকেই বর্জ্যকে পুনরায় ব্যবহার করে খাদ্য তৈরির ধারণাটি গুরুত্ব পাচ্ছে।
গবেষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে প্রযুক্তিটি শুধু মহাকাশে নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন কঠিন পরিবেশেও কাজে লাগতে পারে। সাবমেরিন, দুর্যোগপূর্ণ এলাকা কিংবা দীর্ঘ সময় স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে থাকতে হয়—এমন পরিস্থিতিতে বর্জ্য থেকে খাদ্য উপাদান তৈরির প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
একই সঙ্গে এটি প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য উৎপাদনের দুটি সমস্যাকে একসঙ্গে মোকাবিলার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
প্রযুক্তিটি এখনো গবেষণার পর্যায়ে থাকায় উৎপাদন খরচও বেশি। বর্তমানে গবেষকদের হিসাবে প্রতি কেজি বিস্কুট তৈরিতে প্রায় ৬০ মার্কিন ডলার খরচ হচ্ছে।
তবে ইস্টের কার্যকারিতা বাড়ানো, উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত করা এবং বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু করা গেলে ভবিষ্যতে এই খরচ কমানো সম্ভব বলে গবেষকেরা আশা করছেন।
প্রযুক্তিটি যতই অভিনব হোক, এর সামনে বড় দুটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে—খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানুষের মানসিক গ্রহণযোগ্যতা।
প্লাস্টিক থেকে উৎপন্ন উপাদানকে ইস্টের মাধ্যমে নতুন জৈব পদার্থে রূপান্তর করা হলেও সেটি মানুষের জন্য নিরাপদ কি না, দীর্ঘমেয়াদে শরীরে কী প্রভাব ফেলবে এবং খাদ্য হিসেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়া যাবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর গবেষণার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
গবেষকেরাও স্বীকার করছেন, “প্লাস্টিক থেকে তৈরি খাবার” খাওয়ার ধারণাটি সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলাও বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন