কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় সারের সংকট ও সরবরাহ না পাওয়ার অভিযোগে এক ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে গেছেন বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে ৩৩ জন কৃষক ৩৩ বস্তা সার ফেরত দিয়েছেন। বাকি সার উদ্ধারে চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রোববার (২৩ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের মেসার্স শাহ আমানত ট্রেডার্সের ডিলার পয়েন্টে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে জানা যায়, আমন মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগের জন্য সকাল থেকেই দুই শতাধিক কৃষক ডিলার পয়েন্টে জড়ো হন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও ডিলার পয়েন্ট না খোলায় এবং সার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। একপর্যায়ে কয়েকজন গুদামের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে সার নিয়ে যেতে শুরু করলে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়।
ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিম উদ্দিন জানান, শিলখুড়ি ইউনিয়নে সারের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার বস্তা। এর বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৩২০ বস্তা। তিনি জানান, বরাদ্দের পুরো পরিমাণ সারও বাস্তবে উত্তোলন করা হয়নি। ফলে সার পাওয়া নিয়ে কৃষকদের মধ্যে শঙ্কা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার জানান, সংশ্লিষ্ট ডিলারের নামে ৩৪০ বস্তা সার উত্তোলন করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ১৯৭ বস্তা কৃষকেরা নিয়ে যান। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।
ঘটনার খবর পেয়ে ভূরুঙ্গামারী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে পুলিশের অনুরোধে ৩৩ জন কৃষক একটি করে মোট ৩৩ বস্তা সার ফেরত দেন। তবে বাকি সার তখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
প্রায় ৫০ কেজি করে প্রতি বস্তা ধরা হলে ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সারের মোট ওজন প্রায় ৯ হাজার ৮৫০ কেজি, অর্থাৎ প্রায় ৯ দশমিক ৮৫ টন।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, চলতি আমন মৌসুমে তারা কয়েক দফা ডিলারের কাছে গিয়েও প্রয়োজনীয় সার পাননি। একই সময়ে খোলাবাজারে বেশি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে—এমন অভিযোগও করেছেন কয়েকজন কৃষক। সার সংকটের কারণে আমন চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
তবে কৃষকদের অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত বা অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
সংশ্লিষ্ট ডিলার তাইফুর রহমান মুকুল সাংবাদিকদের বলেন, কৃষকদের সঙ্গে একটি দুর্বৃত্ত চক্র মিশে গুদামের দরজা ভেঙে সার নিয়ে গেছে। তাঁর দাবি, তিনি সরকারিভাবে যতটুকু সার বরাদ্দ পাচ্ছেন, সেই পরিমাণই সরকারি দামে কৃষকদের কাছে বিক্রি করছেন। চাহিদার তুলনায় সরকারি বরাদ্দ কম হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে কৃষকদের অভিযোগ, চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ না পাওয়ায় তারা দীর্ঘদিন ধরে সমস্যায় রয়েছেন।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথ জানিয়েছেন, ঘটনার সময় তিনি জেলা পর্যায়ের একটি সভায় ছিলেন। বিস্তারিত তথ্য জানার পর বিষয়টি সম্পর্কে জানাতে পারবেন বলে তিনি জানান।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং উদ্ধার হওয়া সার নিরাপদে রাখা হয়েছে। বাকি সার উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
কৃষি মৌসুমে সময়মতো সার না পাওয়া কৃষকদের উৎপাদন কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। শিলখুড়ি ইউনিয়নে চাহিদা ও বরাদ্দের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকার বিষয়টিও স্থানীয় পর্যায়ে সারের সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। তবে সংকটের প্রকৃত কারণ, বিতরণব্যবস্থায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না এবং গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় কারা জড়িত—এসব বিষয়ে প্রশাসনিকভাবে তদন্তের ফল পাওয়া গেলে পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন