আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, ড্রোন, সামরিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়ছে।
এর মধ্যে চীনের কাছ থেকে আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া এবং পাকিস্তানের সঙ্গে JF-17 যুদ্ধবিমান নিয়ে আলোচনা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনী আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চীনের তৈরি J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।
২৫ আগস্ট ২০২৬ প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান জানান, J-10CE এবং অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে আলোচনার পর একটি খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করেছে সরকারি কমিটি।
খসড়া প্রস্তাবটি অর্থ মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে চলতি অর্থবছরেই ক্রয় প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হতে পারে।
অর্থের ব্যবস্থা না হলে বিষয়টি পরবর্তী অর্থবছরের বাজেটে নেওয়া হতে পারে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ২০ থেকে ২৪টি J-10CE কেনার কথা বলা হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কতটি বিমান কেনা হবে তা জানায়নি।
একইভাবে চূড়ান্ত মূল্য ও সরবরাহের সময়সূচিও প্রকাশ করা হয়নি। এসব বিষয় চূড়ান্ত আলোচনার পর নির্ধারণ হওয়ার কথা।
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা ক্রয় পরিকল্পনায় শুধু J-10CE নেই। রয়েছে চীনের কাছ থেকে অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি পরিবহন হেলিকপ্টার এবং বিভিন্ন ধরনের ইউএভি বা ড্রোন ব্যবস্থাও নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
বাংলাদেশের সরকারি তথ্যের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।
এর ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুধু অস্ত্র কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকেও এগোচ্ছে।
বাংলাদেশ ও চীনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হচ্ছে ড্রোন প্রযুক্তি।
বাংলাদেশে ইউএভি উৎপাদন ও প্রযুক্তি সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়টি নিয়েও চীনের সঙ্গে সহযোগিতা এগিয়েছে।
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে সামরিক ড্রোনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চীনের পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কও সাম্প্রতিক সময়ে সক্রিয় হয়েছে।
বিশেষ করে দুই দেশের বিমানবাহিনীর মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বেড়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানে সফর করেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধুর সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মহাকাশ ও বিমান প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়।
ওই বৈঠকে পাকিস্তান ও চীনের যৌথভাবে তৈরি JF-17 Thunder যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ ISPR জানিয়েছিল, বৈঠকে JF-17 যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ এখনো JF-17 কেনার কোনো চূড়ান্ত চুক্তি ঘোষণা করেনি।
অর্থাৎ, বিষয়টি এখনো আলোচনা ও সম্ভাব্য ক্রয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে আধুনিকায়ন করার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।
পুরোনো যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে আধুনিক বহুমুখী যুদ্ধবিমান যুক্ত করা, আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা এবং ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে এই আধুনিকায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ।
গত দুই দশকে চীন বাংলাদেশকে যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে।
J-10CE কেন আলোচনায়?
J-10CE হলো চীনের J-10C যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ।
এটি বহুমুখী যুদ্ধবিমান হিসেবে আকাশ থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে স্থল—দুই ধরনের মিশনে ব্যবহারের জন্য তৈরি।
পাকিস্তান বর্তমানে চীনের বাইরে J-10CE-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারকারী।
২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় পাকিস্তানের J-10 যুদ্ধবিমান ব্যবহারের বিষয়টি বাংলাদেশও গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে বলে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জানিয়েছেন।
তবে ওই সংঘাতে কোন বিমান কতটি শত্রু বিমান ভূপাতিত করেছে—এ নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের দাবি পরস্পরবিরোধী। তাই এসব দাবিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।
J-10CE কেনার চুক্তি চূড়ান্ত হয়ে তা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
আধুনিক যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি নতুন হেলিকপ্টার ও ড্রোন যুক্ত হলে নজরদারি, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং বিভিন্ন সামরিক অভিযানে সক্ষমতা বাড়তে পারে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে JF-17 নিয়ে আলোচনা এগোলে বাংলাদেশের জন্য আরও একটি যুদ্ধবিমান সরবরাহের বিকল্প তৈরি হবে।
চীন ও পাকিস্তান—দুই দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা যোগাযোগ বাড়ার বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি।
বরং এসব উদ্যোগকে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়ন এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, চীনের সঙ্গে J-10CE, হেলিকপ্টার ও ড্রোন নিয়ে ক্রয়প্রক্রিয়া এগোচ্ছে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে JF-17সহ প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন