বানিজ্য ডেস্কঃ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পকারখানা পুনরায় চালু, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং স্থবির অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ১৭টি ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এসব ব্যাংক থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। আগামী সেপ্টেম্বরের শুরুতে এ তহবিলের আওতায় ঋণ বিতরণ শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে জোগান দেওয়া হবে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে সরবরাহ করবে।
প্রণোদনা প্যাকেজে অর্থ দিতে সম্মত হওয়া ১৭টি ব্যাংক হলো—সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, এনসিসি ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও সাউথইস্ট ব্যাংক।
তবে ১৭টি ব্যাংক অর্থের জোগান দেওয়ার চুক্তি করলেও ঋণের পুরো ৪১ হাজার কোটি টাকা এসব ব্যাংকের শাখা থেকেই বিতরণ করা হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তহবিলের অর্থ পরবর্তীতে মোট ৩৭টি ব্যাংকের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো গড়ে প্রায় ৭ শতাংশ সুদে শিল্প উদ্যোক্তাদের ঋণ দেবে। তহবিলের অর্থ যাতে অপব্যবহার না হয়, সে জন্য ঋণ বিতরণ ও অর্থের ব্যবহার একটি কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে নজরদারি করা হবে।
এই প্রণোদনা প্যাকেজের সবচেয়ে বড় অংশ, অর্থাৎ ২০ হাজার কোটি টাকা, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এসব কারখানায় উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৩ মে ২০২৬ এই ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান তখন কর্মসূচিটিকে ‘উৎপাদন ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার’ কর্মসূচি হিসেবে উল্লেখ করেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন বন্ধ বা সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা হলে শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরবে। বিশেষ করে উৎপাদন খাতে নতুন অর্থপ্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করাই এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
তবে এই তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এসেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যেসব কারখানা বন্ধ হওয়ার মূল কারণ এখনো দূর হয়নি, সেখানে নতুন করে ঋণ দেওয়া হলে ব্যাংকের জন্য ঋণখেলাপির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট বা উৎপাদনসংক্রান্ত মৌলিক সমস্যার সমাধান না করে বন্ধ কারখানায় অর্থায়ন করা হলে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
এ কারণে ঋণ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা, বন্ধ হওয়ার কারণ এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে প্রণোদনার অর্থ কোনো অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যাচ্ছে কি না, সেটিও কঠোরভাবে নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ঋণের অর্থের ব্যবহার পর্যবেক্ষণে ড্যাশবোর্ডভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কোন প্রতিষ্ঠান কত টাকা ঋণ পেয়েছে এবং অর্থ কীভাবে ব্যবহার করছে, তা পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকবে।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই এই প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ বিতরণ শুরু হতে পারে। এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুত অর্থ ছাড়ের পাশাপাশি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা, যাতে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু হয় এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে প্রত্যাশিত গতি আসে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন