বাংলাদেশি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১০% শুল্ক, চীন-ভিয়েতনাম-থাইল্যান্ডে ১২.৫%।

মার্কিন শুল্ক আরোপ

বানিজ্য ডেস্কঃ বাংলাদেশি পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের Section 301-এর আওতায় এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। শুক্রবার, ২৪ জুলাই থেকে নতুন শুল্কহার কার্যকর হয়।

তবে বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। কারণ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশ ২ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট কম শুল্কের মুখোমুখি হচ্ছে।

ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী হতে পারে বলে মনে করছে সরকার। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে এই শুল্ক ব্যবধানকে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশে ১০ শতাংশ শুল্ক কেন?

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (USTR) জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে ৬০টি অর্থনীতির বিরুদ্ধে Section 301-এর আওতায় তদন্ত করা হয়েছে।

এই তদন্তের পর দেশগুলোকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করে শুল্কহার নির্ধারণ করা হয়েছে। যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি ঠেকাতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অথবা আংশিক পদক্ষেপ নিয়েছে, তাদের জন্য ১০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া, কানাডা, মেক্সিকো, যুক্তরাজ্যসহ মোট ১৭টি অর্থনীতি এই ১০ শতাংশ শুল্কের আওতায় রয়েছে।

অন্যদিকে, যেসব অর্থনীতি জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর আমদানি নিষেধাজ্ঞা নেয়নি, তাদের জন্য শুল্কহার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনসহ বেশ কয়েকটি দেশ।

চীন-ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশের সুবিধা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে চীন ও ভিয়েতনাম অন্যতম। পাশাপাশি থাইল্যান্ডও মার্কিন বাজারে পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে।

নতুন শুল্ক কাঠামোয় বাংলাদেশকে ১০ শতাংশ এবং চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। ফলে শুল্কের হিসাবে বাংলাদেশ এসব প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট সুবিধা পাচ্ছে।

মার্কিন ক্রেতারা যদি শুল্কের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে বাংলাদেশ নতুন অর্ডার পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। এমনকি চীন বা ভিয়েতনাম থেকে কিছু অর্ডার বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

তবে ঝুঁকিও রয়েছে

শুল্কের হার তুলনামূলক কম হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি খাত পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার।

নতুন শুল্কের কারণে মার্কিন আমদানিকারকদের খরচ বাড়লে তারা বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে পণ্যের দাম কমানোর চাপ দিতে পারেন। এতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফায় চাপ পড়তে পারে।

আবার কোনো কোনো মার্কিন ক্রেতা শুল্ক ও উৎপাদন ব্যয়ের হিসাব করে অন্য দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। ফলে শুধু শুল্কের হার কম—এমন কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি নিশ্চিতভাবে বাড়বে, এমনটা বলা যাচ্ছে না।

সরকারের অবস্থান কী?

বাংলাদেশ সরকার অবশ্য নতুন শুল্ক নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন নয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটিকে একেবারে নতুন অতিরিক্ত শুল্ক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের বক্তব্য অনুযায়ী, আগের শুল্ক ব্যবস্থার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন ব্যবস্থায় সেটি প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ফলে নাম ও আইনি কাঠামো পরিবর্তন হলেও শুল্ক ব্যবস্থায় বড় ধরনের বাস্তব পরিবর্তন হয়নি বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

এ কারণে সরকার মনে করছে, নতুন শুল্কের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা কম।

অর্থনীতিবিদরা কী বলছেন?

অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অবশ্য সরকারের চেয়ে কিছুটা সতর্ক। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বড় হওয়ায় শুল্কনীতির পরিবর্তনকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

শুল্কের কারণে মার্কিন ক্রেতাদের খরচ বাড়লে তার একটি অংশ বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের ওপর পড়তে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে ক্রেতারা দাম কমানোর চাপ দিলে কারখানার মুনাফা কমতে পারে।

তবে একই সঙ্গে চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের তুলনায় বাংলাদেশের ২ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট কম শুল্ককে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন অনেকে।

সব পণ্যে কি এই শুল্ক প্রযোজ্য?

না। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, নতুন Section 301 শুল্ক সব ধরনের পণ্যের ওপর প্রযোজ্য হবে না।

তথ্যভিত্তিক সামগ্রী, অনুদান, যাত্রীর সঙ্গে বহন করা লাগেজ, Section 232-এর আওতাভুক্ত কিছু পণ্যসহ নির্দিষ্ট কিছু পণ্য এই নতুন শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া এমন কিছু কাঁচামাল ও পণ্যও ছাড়ের আওতায় রাখা হয়েছে, যেগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সরবরাহে সংকট বা অর্থনীতিতে বড় ধরনের ব্যাঘাত তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন কী সুযোগ?

সবকিছু মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক বাংলাদেশের জন্য একদিকে চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সম্ভাবনার দরজাও খুলেছে।

বাংলাদেশকে ১০ শতাংশ Section 301 শুল্ক দিতে হলেও চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশকে দিতে হচ্ছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে শুল্কের হিসাবে বাংলাদেশ ২ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট সুবিধায় রয়েছে।

এই সুবিধা কাজে লাগাতে পারলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যের অর্ডার বাড়তে পারে। তবে সেই সুযোগ নিতে হলে পণ্যের দাম প্রতিযোগিতামূলক রাখা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, মান বজায় রাখা এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য নতুন শুল্ক কতটা সুবিধা বা কতটা চাপ তৈরি করবে, তা নির্ভর করবে মার্কিন ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত, বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের দাম এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর বাজার কৌশলের ওপর।

অর্থাৎ বাংলাদেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলেও চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের তুলনায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট কম শুল্ক—এই ব্যবধানই এখন বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ