সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়: যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেই থাকবে মার্কিন নাগরিকত্বের অধিকার।

যুক্তরাষ্ট্র কোর্টের রায়

 আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব (Birthright Citizenship) নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনেছে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে স্পষ্ট করেছে, দেশটির ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া শিশুদের মার্কিন নাগরিকত্বের সাংবিধানিক অধিকার বহাল থাকবে। আদালতের এই সিদ্ধান্ত অভিবাসন নীতিকে ঘিরে চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং লাখো অভিবাসী পরিবারের জন্য স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ছয় বনাম তিন ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রায় সব শিশুই জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। কেবল নির্বাহী আদেশ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই সাংবিধানিক অধিকার বাতিল বা সীমিত করা সম্ভব নয়।

রায়ের মাধ্যমে আদালত কার্যত সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই উদ্যোগকে অকার্যকর করে দেয়, যেখানে অবৈধভাবে বসবাসকারী কিংবা অস্থায়ী ভিসাধারী অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানদের স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব সীমিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আদালত জানায়, এমন কোনো পরিবর্তন আনতে হলে সংবিধান সংশোধনের মতো কঠিন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে বলেন, সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তা এখনো কার্যকর রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া এবং দেশটির আইনের আওতাভুক্ত প্রায় প্রত্যেক শিশুই নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার রাখে। এই নীতি আদালতের বহু পুরোনো নজিরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আদালত বিশেষভাবে ১৮৯৮ সালের ঐতিহাসিক United States v. Wong Kim Ark মামলার রায়ের কথাও উল্লেখ করে। সেই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট প্রথমবার স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিল, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া একটি শিশু তার বাবা-মায়ের অভিবাসন অবস্থান যাই হোক না কেন, সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর অধীনে মার্কিন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। বর্তমান রায়ে আদালত জানিয়ে দিয়েছে, সেই ঐতিহাসিক নজির এখনো সম্পূর্ণভাবে বহাল রয়েছে এবং এটিই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক ভিত্তি।

তবে এই রায়ের সঙ্গে একমত হননি তিন বিচারপতি—স্যামুয়েল আলিটো, ক্লারেন্স থমাস এবং নিল গরসাচ। তাদের ভিন্নমতে বলা হয়, ১৪তম সংশোধনীর ব্যাখ্যা নতুন বাস্তবতায় পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা সেই যুক্তি গ্রহণ করেননি।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিল বা সীমিত করার চেষ্টা করলে তা আদালতে টিকবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধান প্রদত্ত নাগরিকত্বের অধিকারকে আরও শক্তিশালী করেছে। প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বিপুল সংখ্যক শিশুর নাগরিকত্ব নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, আদালতের এই রায়ের মাধ্যমে তা অনেকটাই দূর হলো।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই রায় ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও অভিবাসন ইস্যুকে আরও গুরুত্ব দেবে। তবে আপাতত সুপ্রিম কোর্টের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের নাগরিকত্বের সাংবিধানিক অধিকার আগের মতোই বহাল থাকছে।

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post a Comment (0)

নবীনতর পূর্বতন