ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশের বিদায়, রশিদ খানের ঘূর্ণিতে তছনছ ব্যাটিং—শেষ হলো ফাইনালের স্বপ্ন
প্রগতি বার্তা | ক্রীড়া ডেস্ক
স্বপ্ন ছিল ফাইনালে ওঠার, সামনে ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু মাঠে নামার পর সেই স্বপ্ন যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল একের পর এক উইকেট পতনে। জিম্বাবুয়ের কাছে বড় ব্যবধানে হারের পর এবার আফগানিস্তানের বিপক্ষেও ব্যাটিং বিপর্যয়। শেষ পর্যন্ত সাত উইকেটের পরাজয়ে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ থেকে বিদায় নিতে হলো বাংলাদেশকে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে টস জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত কাজে লাগাতে পারেনি তাওহীদ হৃদয়ের দল। ৪১.২ ওভারে সব উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় মাত্র ১৬০ রান। জবাবে ৩৫.৩ ওভারে তিন উইকেট হারিয়ে ১৬১ রান তুলে সহজ জয় নিশ্চিত করে আফগানিস্তান।
বাংলাদেশের ইনিংসের শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম মাত্র ১ রান করে ইয়ামিন আহমদজাইয়ের বলে আউট হন। পরের বলেই বোল্ড হয়ে ফেরেন সৌম্য সরকার, তাঁর নামের পাশে কোনো রানই যোগ হয়নি।
দুই ওপেনারের দ্রুত বিদায়ের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই বিপদ আরও বাড়ে। নাজমুল হোসেন শান্ত ১৫ রান করে আজমতউল্লাহ ওমরজাইয়ের শিকার হন। এরপর অধিনায়ক তাওহীদ হৃদয়ও কোনো রান না করে একই বোলারের বলে ফিরে যান।
মাত্র সাত ওভারের মধ্যে ২৮ রানে চার উইকেট হারিয়ে চরম বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ। তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বড় সংগ্রহ গড়ার বদলে ইনিংস বাঁচানোই হয়ে উঠেছে দলের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
দলের এমন বিপর্যয়ের মধ্যে হাল ধরার চেষ্টা করেন পারভেজ হোসেন ইমন ও সাইফ হাসান। একজন আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে রান তোলার চেষ্টা করেন, অন্যজন উইকেটে টিকে থেকে ইনিংস মেরামতের দায়িত্ব নেন।
পঞ্চম উইকেটে দুজনের ৯৩ রানের জুটি বাংলাদেশকে ২৮ রান থেকে ১২১ রানে নিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশের ইনিংসে কিছুটা স্থিতি ফেরে। পারভেজ তুলে নেন নিজের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সেরা ৭০ রান। ৯৬ বলের ইনিংসে তিনি মারেন পাঁচটি চার ও দুটি ছক্কা।
অন্যদিকে সাইফ হাসান করেন ৮২ বলে ৪১ রান। তবে পারভেজের সঙ্গে তাঁর এই গুরুত্বপূর্ণ জুটি ভাঙতেই আবারও বিপদে পড়ে বাংলাদেশ। মোহাম্মদ নবির বলে বড় শট খেলতে গিয়ে মিডউইকেটে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন সাইফ। দলীয় ১২১ রানে ভাঙে সেই প্রতিরোধ।
সাইফের বিদায়ের পর বাংলাদেশের ইনিংসে আর কোনো কার্যকর প্রতিরোধ দেখা যায়নি। মেহেদী হাসান মিরাজ মাত্র ২ রান করে ফিরে গেলে চাপ আরও বাড়ে। এরপর বল হাতে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন আফগানিস্তানের অভিজ্ঞ লেগ স্পিনার রশিদ খান।
একসময় যে ইনিংস ২০০ রানের দিকে এগোনোর সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, সেটিই দ্রুত গুটিয়ে যায়। রশিদের ঘূর্ণিতে দিশেহারা হয়ে পড়েন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। তিনি একে একে শোরিফুল ইসলাম, পারভেজ হোসেন ইমন, আলিস আল ইসলাম ও মোস্তাফিজুর রহমানকে ফিরিয়ে বাংলাদেশের শেষ দিকের ব্যাটিং লাইনআপ ধসিয়ে দেন।
রশিদ খান ৮.২ ওভারে ৩১ রান দিয়ে নেন চার উইকেট। ইয়ামিন আহমদজাই ও আজমতউল্লাহ ওমরজাই পান দুটি করে উইকেট। শেষ ছয় উইকেট হারাতে বাংলাদেশ মাত্র ৩৯ রান যোগ করতে পারে। ফলে ৪১.২ ওভারেই শেষ হয় ইনিংস, স্কোরবোর্ডে জমা পড়ে ১৬০ রান।
১৬১ রানের লক্ষ্য আফগানিস্তানের জন্য খুব বড় ছিল না। তবু শুরুতে কিছুটা লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিল বাংলাদেশের বোলিং। পেসার তাসকিন আহমেদ পরপর গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রহমানউল্লাহ গুরবাজ ও সেদিকউল্লাহ আতালকে ফিরিয়ে দেন।
সপ্তম ওভারে আফগানিস্তানের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৩৯ রানে দুই উইকেট। অল্প সময়ের জন্য হলেও বাংলাদেশের সামনে ম্যাচে ফেরার ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেননি বাকি বোলাররা।
এরপর অভিজ্ঞতা ও ধৈর্যের পরিচয় দেন আফগান অধিনায়ক রহমত শাহ। ইব্রাহিম জাদরানের সঙ্গে ৫৬ রানের জুটি গড়ে দলকে বিপদমুক্ত করেন তিনি। জাদরান ৩৪ রান করে আউট হলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তখন পুরোপুরি আফগানিস্তানের হাতে।
লক্ষ্য থেকে বাংলাদেশকে দূরে রাখার মতো বোলিং আর করতে পারেনি টাইগাররা। রহমত শাহ ও হাশমতউল্লাহ শহিদি দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন।
রহমত শাহ ৯০ বলে অপরাজিত ৬৭ রান করেন। অন্যদিকে হাশমতউল্লাহ শহিদি ৩৬ রানে অপরাজিত থাকেন। তাঁদের অবিচ্ছিন্ন ৬৬ রানের জুটিতে ৩৫.৩ ওভারেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় আফগানিস্তান। বাংলাদেশের হয়ে তাসকিন আহমেদ দুটি এবং মোস্তাফিজুর রহমান একটি উইকেট নেন।
চার উইকেট নিয়ে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়ায় রশিদ খান হন ম্যাচসেরা।
এই ম্যাচে বাংলাদেশের সামনে সমীকরণ ছিল কঠিন। ফাইনালে ওঠার আশা বাঁচিয়ে রাখতে আফগানিস্তানকে ১২০ রানের নিচে আটকে রেখে জয়ের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ব্যাট হাতে ১৬০ রানেই অলআউট হয়ে যাওয়ায় সেই লক্ষ্য পূরণের সম্ভাবনা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে।
এর আগে ১৭ অক্টোবর সিরিজের উদ্বোধনী ম্যাচে জিম্বাবুয়ের কাছে ৯৯ রানে হেরেছিল বাংলাদেশ। আফগানিস্তানের কাছে সাত উইকেটের পরাজয়ে দুই ম্যাচেই হার নিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হলো দলকে। অন্যদিকে আফগানিস্তান জায়গা করে নিয়েছে ফাইনালে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে।
দুই ম্যাচে পরপর পরাজয়ের পর বাংলাদেশের ব্যাটিং পরিকল্পনা ও চাপ সামলানোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম সাত ওভারে চার উইকেট হারানো এবং শেষ ছয় উইকেটে মাত্র ৩৯ রান যোগ করা দলের দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট করে দিয়েছে।
পারভেজ হোসেন ইমনের ৭০ রানের লড়াকু ইনিংস এবং সাইফ হাসানের ৪১ রান ছাড়া ব্যাটিংয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল না। একজন বা দুজনের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচ জেতা কঠিন—এই ম্যাচেও সেটিই যেন আবারও সামনে এলো।
ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশের বিদায় এখন নিশ্চিত। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, একই ধরনের ব্যাটিং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না তাওহীদ হৃদয়ের দল? সমর্থকদের প্রত্যাশা, হতাশার এই অধ্যায় পেছনে ফেলে দ্রুতই শক্তিশালী রূপে ফিরবে টাইগাররা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন