বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ইরাকের উত্তরাঞ্চলের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চল থেকেও মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়। এর আগে ২০২৫ সালেই ইরাকের অধিকাংশ এলাকা ও ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যায়ে কুর্দি অঞ্চলে কয়েকশ মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাক দুই ধাপে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের ইরাক মিশন শেষ করার বিষয়ে একটি পরিকল্পনায় একমত হয়। পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাকে জোটের সামরিক মিশন শেষ করে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতায় যাওয়ার কথা ছিল। দ্বিতীয় ধাপে ইরাকের ঘাঁটি ব্যবহার করে সিরিয়ায় আইএসবিরোধী অভিযান চালানোর সুযোগও ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাখার কথা বলা হয়েছিল।
ইরাকে মার্কিন সেনা উপস্থিতির ইতিহাস অবশ্য আরও পুরোনো। ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতের অভিযানের মাধ্যমে দেশটিতে মার্কিন সেনা প্রবেশ করে। দীর্ঘ সময় অবস্থানের পর ২০১১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন সেনাদের বড় অংশ ইরাক থেকে চলে যায়। তবে ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট বা আইএস ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করলে ইরাকি সরকারের আমন্ত্রণে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট আবারও দেশটিতে সামরিক উপস্থিতি বাড়ায়।
আইএসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ইরাকি বাহিনী ও আন্তর্জাতিক জোটের দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সংগঠনটি ইরাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড হারায়। ২০২১ সালে জোটের সামরিক অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলেও ইরাকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার কাজে থেকে যায়। পরে ২০২৪ সালের সমঝোতার মাধ্যমে সেই উপস্থিতিও পর্যায়ক্রমে শেষ করার সিদ্ধান্ত হয়।
সর্বশেষ পর্যায়ে কুর্দি অঞ্চলে থাকা মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহারকে ঘিরে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের পেশমার্গা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে সেখানে বিকল্প কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করা হচ্ছে না। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের সময় কুর্দি অঞ্চলে এক হাজারের বেশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরাকের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তবে মার্কিন সেনা চলে গেলেও দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত হয়নি। আইএসের সামরিক সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক কমে গেলেও বিভিন্ন এলাকায় তাদের বিচ্ছিন্ন ‘স্লিপার সেল’ সক্রিয় থাকার কথা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ইরাকের শক্তিশালী কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী অস্ত্র সমর্পণে অনিচ্ছুক।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন আরও বেশি দেশটির নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী, সেনাবাহিনী ও কুর্দি পেশমার্গার ওপর নির্ভর করবে। যুক্তরাষ্ট্রও জানিয়েছে, ইরাকের সঙ্গে সামরিক উপস্থিতির পরিবর্তে ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
ফলে ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শুধু একটি সামরিক মিশনের সমাপ্তি নয়; ২০০৩ সালের মার্কিন আগ্রাসনের পর দেশটিতে গড়ে ওঠা দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতিরও অবসান।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন