ডেস্ক রিপোর্টঃ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর ঢাকাজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এসব বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, যাত্রাবাড়ী, বাবুবাজার, বঙ্গবাজার, গুলিস্তান, মগবাজার, মৌচাক ও রামপুরা রয়েছে। একই রাতে কাফরুল থানার সামনে একটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এসব ঘটনার পর শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড়, উড়ালসড়ক ও প্রবেশপথে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। সন্দেহজনক ব্যক্তি ও যানবাহনের পাশাপাশি মোটরসাইকেল, সিএনজি ও মাইক্রোবাসের ওপর বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে।
পুলিশ ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, শুক্রবার জুমার নামাজের পর মালিবাগ রেলগেটসংলগ্ন এলাকায় সোহাগ পরিবহনের কাউন্টারের পাশে দুটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ফ্লাইওভারের ওপর থেকে ককটেল দুটি ছোড়া হয়ে থাকতে পারে। ঘটনাটি তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করা হচ্ছে।
এরপর সন্ধ্যার দিকে মহাখালী ফ্লাইওভার থেকে নিচে একটি ককটেল ছোড়ার ঘটনা ঘটে। প্রায় একই সময়ে আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ বেতার ভবনের সামনেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
রাত আনুমানিক ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় পরপর চার থেকে পাঁচটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে এক রিকশাচালক আহত হন। তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছে। কারা এসব বিস্ফোরণের সঙ্গে জড়িত, তা শনাক্তে তদন্ত চলছে।
যাত্রাবাড়ীর ঘটনার পর রাত ৭টা ৫৮ মিনিটের দিকে বাবুবাজার ব্রিজের নিচে একটি মাজারের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এরপর রাত সোয়া ৯টার দিকে মগবাজার চৌরাস্তা জামে মসজিদের পাশেও একটি ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। একই রাতে বঙ্গবাজার, গুলিস্তান ও মৌচাক এলাকাতেও বিস্ফোরণের তথ্য পাওয়া যায়।
সর্বশেষ রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনের সামনেও ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।
শুক্রবার রাত ১০টা ১০ মিনিটের দিকে কাফরুল থানার সামনে একটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে।
ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো একই দিনে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ঘটায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করে। তবে সব ঘটনার মধ্যে সমন্বিত কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা হয়নি।
শনিবার সকাল থেকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও প্রবেশপথে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো হয়। ডিএমপি জানিয়েছে, যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে সন্দেহজনক ব্যক্তি ও যানবাহনে নিবিড় তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট ও পিকেট ডিউটি বাড়ানোর পাশাপাশি পুলিশি টহলও জোরদার করা হয়েছে। শহরের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে মোটরসাইকেল আরোহীদের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে দুজন আরোহী থাকা মোটরসাইকেল থামিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। পাশাপাশি সিএনজি ও মাইক্রোবাসও তল্লাশির আওতায় রয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন উড়ালসড়কের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথেও নজরদারি করা হচ্ছে। শুক্রবারের কয়েকটি ঘটনায় ফ্লাইওভার থেকে ককটেল নিক্ষেপের তথ্য পাওয়ায় এসব স্থানে নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্যদেরও বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, জনসমাগমপূর্ণ এলাকা, প্রধান সড়ক ও প্রবেশপথে গোয়েন্দা নজরদারি এবং টহল বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ অভিযানও চলছে বলে ডিএমপি জানিয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশের পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)ও মাঠে রয়েছে। এসআরবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজধানীতে তাদের ৪০টি চেকপোস্ট রয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত ও বিশেষ টহল এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছে।
ডিএমপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নিয়মিত অভিযান ও বিভিন্ন মামলায় ৫৪৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ৫১টি মামলা করা হয়েছে—এ তথ্য শনিবার রাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উদ্ধৃত হয়েছে।
এ সময় দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ১০ রাউন্ড গুলি, তিনটি চাপাতি, পাঁচটি চাকু এবং বিস্ফোরিত ককটেলের অংশবিশেষসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধারের কথা জানানো হয়। এছাড়া মাদকও উদ্ধার করা হয়েছে।
অন্যদিকে একই দিনের আরেক ডিএমপি বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নিয়মিত অভিযানে ৫১৫ জন গ্রেফতারের তথ্যও এসেছে। এই দুই সংখ্যার পার্থক্য সম্ভবত গণনার সময়সীমা বা অভিযানের ধরনভেদে হয়েছে; তাই সংখ্যাটি উদ্ধৃত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ডিএমপি বিজ্ঞপ্তির সময়সীমা অনুসরণ করা জরুরি।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে একই দিনে ককটেল বিস্ফোরণ এবং কাফরুলে বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় কারা জড়িত, তা শনাক্তে তদন্ত করছে পুলিশ। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে সবগুলো ঘটনার পেছনে একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ছিল—এমন কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়নি। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনার সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নিশ্চিতভাবে দায়ী করা যাচ্ছে না।
রাজধানীর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড়, উড়ালসড়ক ও প্রবেশপথে তল্লাশি ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে নগরবাসীর সহযোগিতাও চেয়েছে ডিএমপি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন