আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ তৈরির লক্ষ্যে করা সমঝোতা স্মারকের (MoU) নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা সোমবার (১৭ আগস্ট) শেষ হচ্ছে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন করে সমঝোতায় পৌঁছানো বা আলোচনা পুনরায় শুরুর বিষয়ে এখনো স্পষ্ট অগ্রগতি নেই। বরং সমঝোতা স্বাক্ষরের পর থেকেই দুই দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে।
গত ১৭ জুন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে সমঝোতা স্মারকটি সই হয়। এর লক্ষ্য ছিল কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটানো এবং পরবর্তী সময়ে একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো। সমঝোতায় ৬০ দিনের মধ্যে একটি ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ করার কথা বলা হয়েছিল। পারস্পরিক সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগও রাখা হয়েছিল।
সমঝোতার অন্যতম লক্ষ্য ছিল সামরিক অভিযান বন্ধ করা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে স্থায়ীভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর পথ তৈরি করা। পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানি, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল এবং ইরানের জব্দ করা অর্থের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরবর্তী আলোচনায় সমাধানের কথা ছিল।
সমঝোতার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে কিছু ছাড় এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ও উল্লেখ ছিল। অন্যদিকে ইরানের ওপর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করার প্রত্যাশা ছিল।
ইরান একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করবে না বলে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ পারমাণবিক কর্মসূচির বিভিন্ন দিক নিয়ে পরবর্তী চূড়ান্ত চুক্তিতে আলোচনা করার কথা ছিল।
সমঝোতা স্বাক্ষরের পরপরই এর ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিভিন্ন সামরিক কর্মকাণ্ডকে সমঝোতা লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে তেহরান অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্রও সমঝোতার শর্ত মানছে না।
রয়টার্সের ১২ আগস্টের প্রতিবেদনে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। ইরানের দাবি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রকে আগে জুনের অন্তর্বর্তী সমঝোতায় ফিরে এসে নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময়সূচি দিতে হবে।
এর আগে কিছু প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সরকারি সূত্রের বরাতে দুই পক্ষ নীতিগতভাবে মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তবে ইরানি পক্ষ তা অস্বীকার করে। ফলে মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে প্রকাশ্য তথ্যের মধ্যেই মতবিরোধ রয়েছে।
সমঝোতা কার্যকর রাখার বিষয়ে বিরোধ দ্রুত তীব্র হয়। ৭ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, চুক্তি শেষ হয়ে গেছে। এরপরও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যায় বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের কারণে তারা নিজেদের প্রতিশ্রুতিও স্থগিত করেছে।
ফলে ১৭ আগস্টের ৬০ দিনের সময়সীমা নিয়ে দুই দেশের অবস্থান এক নয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, সমঝোতাটি মূলত যুদ্ধের অবসানের জন্য ছিল, শুধু ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির জন্য নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র শর্ত লঙ্ঘন করায় কার্যকর কোনো ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি অবশিষ্ট নেই, যার মেয়াদ আবার বাড়াতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হয়। যুদ্ধের পর থেকে প্রণালিটির স্বাভাবিক নৌ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর ইরান কার্যত প্রণালিটি বন্ধ করে দেয় এবং বিশ্বে পরিবহন হওয়া তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় একটি অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল।
ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর চাপ ও অবরোধের নীতি পরিবর্তন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক চলাচল পুরোপুরি ফিরবে না। অন্যদিকে ওয়াশিংটন প্রণালিটি উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ফলে হরমুজ নিয়ে মতপার্থক্য যেকোনো নতুন সমঝোতার অন্যতম বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরু করার বিষয়ে তেহরান এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে পাকিস্তান ও কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে।
অর্থাৎ, ১৭ আগস্টের সময়সীমা শেষ হওয়া মানেই তাৎক্ষণিকভাবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে কার্যকর রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে সংঘাতের ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং দুই দেশের সামরিক অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য দূর করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে—ওয়াশিংটন ও তেহরান শেষ পর্যন্ত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে নতুন আলোচনায় ফিরবে, নাকি সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও পারস্পরিক চাপ ও পাল্টা অবস্থান অব্যাহত রাখবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন