বাংলা নাটকের অন্যতম প্রধান নাট্যকার ও নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হচ্ছে নানা নাট্য ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে নাট্যোৎসব, নাটক মঞ্চায়ন, আলোচনা সভা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বিভিন্ন নাট্যসংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।
সেলিম আল দীনের জন্মদিন ১৮ আগস্ট। ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাংলা নাটকে দেশীয় ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি ও শেকড়ের অনুসন্ধানকে নতুন মাত্রা দেওয়ার পাশাপাশি নাট্যতত্ত্ব ও গবেষণায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন এই নাট্যকার।
জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নাটক মঞ্চায়ন, আলোচনা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করা হচ্ছে। নাট্যকর্মী, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের অংশগ্রহণে এসব কর্মসূচিতে সেলিম আল দীনের জীবন, কর্ম, নাট্যভাবনা এবং বাংলা নাটকে তাঁর অবদান নিয়ে আলোচনা হবে।
সেলিম আল দীনের জন্মবার্ষিকী ঘিরে নাট্যসংগঠনগুলোর এমন আয়োজন নতুন নয়। এর আগে তাঁর ৭৬তম জন্মবার্ষিকীতেও ঢাকা থিয়েটার চার দিনব্যাপী নাট্যোৎসব আয়োজন করেছিল। ২০২৫ সালের ওই উৎসবে ‘দেয়াল’ ও ‘নিমজ্জন’ নাটক মঞ্চস্থ হয়।
এবারের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বড় আয়োজনগুলোর একটি তিন দিনব্যাপী ‘সেলিম আল দীন নাট্যোৎসব ২০২৬’। ঢাকা থিয়েটার ও সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সেলিম আল দীনের নাট্যকর্ম ও দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উৎসবে নাটক মঞ্চায়নের পাশাপাশি নাট্যকারের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকার কথা রয়েছে। তবে ২০২৬ সালের উৎসবের পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি ও প্রতিটি পরিবেশনার বিস্তারিত তথ্য আয়োজকদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী প্রকাশ করাই নির্ভরযোগ্য।
সেলিম আল দীন বাংলাদেশের আধুনিক নাট্যচর্চায় দেশীয় ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতিকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ে আসেন। তাঁর নাটকে গ্রামীণ জীবন, লোকজ আখ্যান, মানুষের সংগ্রাম এবং বাংলার ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনাশৈলীর নানা উপাদান উঠে এসেছে।
‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামত মঙ্গল’, ‘হাত হদাই’, ‘চাকা’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘হরগজ’, ‘দহন’, ‘নিমজ্জন’সহ তাঁর বিভিন্ন নাটক বাংলা মঞ্চনাটকের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলা নাটকের শেকড় অনুসন্ধানেও তাঁর গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সেলিম আল দীনের নাট্যচর্চার সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁর উদ্যোগ ও চিন্তার ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয়টি বাংলাদেশের নাট্যশিক্ষা ও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
তাঁর মৃত্যুর পরও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে তাঁর স্মরণে আলোচনা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়ে আসছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও তাঁর ১৮তম প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন নাট্যসংগঠন একাধিক কর্মসূচি পালন করে।
নাট্যসাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য সেলিম আল দীন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও একুশে পদকসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁর নাট্যচর্চা বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।
সেলিম আল দীন ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। পরে তাঁকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুর পরও বিভিন্ন নাট্যদল নিয়মিত তাঁর লেখা নাটক মঞ্চস্থ করে আসছে।
২০২৬ সালের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আবারও তাঁর নাট্যভাবনা, সৃষ্টিকর্ম ও বাংলা নাটকের প্রতি তাঁর অবদান নতুন করে আলোচনায় আসছে। নাট্যোৎসব ও সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলোতে নতুন প্রজন্মের শিল্পী ও দর্শকদের অংশগ্রহণ তাঁর সৃষ্টিকে আরও বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন