'অনলাইন জুয়ার' ফাঁদে নিঃস্ব হাজারো মানুষ, এমএফএসে লেনদেনের পর বিদেশে যাচ্ছে টাকা।

অনলাইন জুয়া
বিশেষ প্রতিনিধিঃ
 অনলাইন জুয়ার প্রলোভনে পড়ে প্রতিদিনই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন অনেক মানুষ। অল্প সময়ে কয়েক গুণ লাভের আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টাকা বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে সংঘবদ্ধ চক্র। শুরুতে সামান্য লাভের সুযোগ দেখিয়ে ব্যবহারকারীদের বিশ্বাস অর্জন করা হলেও পরে বড় অঙ্কের টাকা খোয়ানোর ঘটনা ঘটছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত একাধিক চক্রের সন্ধান পাওয়ার পর এ খাতের অর্থ লেনদেন ও অর্থপাচারের বিষয়টি সামনে এসেছে। তদন্তে বিভিন্ন সময় বিকাশ, নগদ, রকেটসহ মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ব্যাংক হিসাব এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে অনলাইন জুয়া ও অর্থপাচারের অভিযোগে একটি চক্রের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তে ওই চক্রের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। এসব অর্থের একটি অংশ ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে।

অনলাইন জুয়ার অর্থ লেনদেনে এমএফএস ব্যবহারের বিষয়টিও বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে। চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন ব্যক্তির নামে থাকা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ও এজেন্ট নম্বর ব্যবহার করে টাকা সংগ্রহ এবং এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে স্থানান্তর করত। পরে এসব অর্থ বিভিন্ন মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হতো।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে আরও দেখা গেছে, অনলাইন জুয়ার চক্রগুলো তাদের কার্যক্রম আড়াল করতে নিয়মিত ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর, এমএফএস হিসাব ও ব্যাংক হিসাব পরিবর্তন করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিভিন্ন কৌশলে জুয়ার প্ল্যাটফর্মের প্রচার চালানো হয়। বিশেষ করে ক্রিকেট, ফুটবলসহ জনপ্রিয় ক্রীড়া ইভেন্টকে কেন্দ্র করে নতুন ব্যবহারকারী সংগ্রহ করা হয়।

২০২৬ সালের মে মাসে চট্টগ্রামে অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার। অভিযানে তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, এটিএম কার্ড ও ব্যাংকের চেকবই জব্দ করা হয়। তদন্তকারীরা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে জুয়ার প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হতো।

এদিকে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে অর্থ লেনদেন বন্ধ করতে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সন্দেহজনক লেনদেন ও হিসাব শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় অনলাইন জুয়ার একটি চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায় গোয়েন্দা পুলিশ। অভিযানে বিপুলসংখ্যক সিম কার্ড জব্দ করা হয়। তদন্তকারীদের ভাষ্য, চক্রটির ব্যবহৃত বিভিন্ন এমএফএস হিসাবের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে বিদেশে পাঠানোর বিষয়টিও তদন্তে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত চক্রগুলো শুধু সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে না, বরং অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও অর্থপাচারের মাধ্যম হিসেবেও এসব নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া পরিচালনা, এতে অংশগ্রহণে সহায়তা, জুয়ার জন্য ওয়েবসাইট বা অ্যাপ পরিচালনা এবং অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়ার প্রচার ও বিজ্ঞাপন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্স-২০২৫ অনুযায়ী, এসব অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

সিআইডিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। পাশাপাশি সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন শনাক্ত করতে ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অস্বাভাবিক বা দ্রুত কয়েক গুণ লাভের প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে কোনো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টাকা দেওয়া থেকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ প্রথম দিকে লাভ দেখিয়ে বিশ্বাস তৈরি করার পর বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া অনলাইন জুয়া ও প্রতারণামূলক চক্রগুলোর অন্যতম কৌশল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Breaking Bangla News | Latest Bangladesh & World Updates