আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দীর্ঘ কয়েক মাস বিদেশে থাকার পর বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) নেপালে ফিরেছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও নেপালি কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি শের বাহাদুর দেউবা। তার দেশে ফেরাকে ঘিরে দলের নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। একই সঙ্গে ১৫তম সাধারণ সম্মেলন সামনে রেখে দলটির নেতৃত্ব নিয়ে পুরোনো বিরোধও নতুন করে সামনে এসেছে।
দেউবা প্রায় পাঁচ মাসের বেশি সময় বিদেশে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বৃহস্পতিবার তিনি কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তাকে স্বাগত জানান। পরে তিনি নেপালি কংগ্রেসের অসন্তুষ্ট অংশের আয়োজিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দেন।
দেউবার দেশে ফেরার সময়টিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে কয়েক মাস ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছে। একদিকে গগন থাপার নেতৃত্বাধীন অংশ দলীয় কার্যক্রম ও ১৫তম সাধারণ সম্মেলনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে দেউবা-সমর্থকরা তার নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে দলকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রস্তাব দিচ্ছেন।
দেউবা দেশে ফেরার পর তার সমর্থক শিবির থেকে নতুন করে একটি প্রস্তাব সামনে এসেছে। তাদের দাবি, ১৪তম সাধারণ সম্মেলনে নির্বাচিত দেউবাকে আবারও দলের সভাপতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তার নেতৃত্বেই ১৫তম সাধারণ সম্মেলন আয়োজন করা হোক।
দেউবা-সমর্থকদের যুক্তি, এভাবে দুই পক্ষের বিরোধের অবসান ঘটিয়ে দলকে দ্রুত ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব। নেপালি কংগ্রেসের অসন্তুষ্ট অংশের নেতারা মনে করছেন, দেউবার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দলীয় সংকট মোকাবিলায় কাজে লাগতে পারে।
তবে এ প্রস্তাব নিয়ে দলের অন্য অংশে আপত্তি রয়েছে। গগন থাপার নেতৃত্বাধীন পক্ষ বিশেষ সাধারণ সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান নেতৃত্বকে বৈধ মনে করছে এবং সেই কাঠামোর ভিত্তিতেই দলীয় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার অবস্থানে রয়েছে।
নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বের এই বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। গত ১৭ এপ্রিল নেপালের সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে, যেখানে গগন থাপার নেতৃত্বাধীন কমিটিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে থাপার নেতৃত্ব আইনি ভিত্তি পায়।
তবে আগস্টে পরিস্থিতিতে আবার পরিবর্তন আসে। সুপ্রিম কোর্ট ১৭ এপ্রিলের ওই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন গ্রহণ করেছে। সাবেক সভাপতি শের বাহাদুর দেউবা ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পূর্ণ বাহাদুর খড়কার করা আবেদনের পর তিন সদস্যের বেঞ্চ বিষয়টি পুনরায় বিবেচনার অনুমতি দেয়।
এই সিদ্ধান্ত দেউবা-সমর্থকদের নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। তাদের আশা, পুনর্বিবেচনার শুনানিতে আদালতের অবস্থান পরিবর্তন হলে দলীয় নেতৃত্ব নিয়েও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
নেপালি কংগ্রেসের ১৫তম সাধারণ সম্মেলনকে কেন্দ্র করেও দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। গগন থাপার নেতৃত্বাধীন অংশ সম্মেলনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে দেউবা ও শীর্ষ নেতা শেখর কৈরালাকে ঘিরে থাকা অসন্তুষ্ট অংশ আলাদা জাতীয় সমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরছে।
দেউবা-সমর্থক পক্ষের এই সমাবেশকে শুধু দলীয় কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন না অনেকে। কারণ, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে নেপালি কংগ্রেসে আরও বড় ধরনের বিভাজন তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। এমনকি আলাদা রাজনৈতিক দল গঠনের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।
দেশে ফেরার পর দলীয় নেতৃত্বের প্রশ্নের পাশাপাশি দেউবার সামনে আরও কিছু রাজনৈতিক ও আইনি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তার পরিবারের বিরুদ্ধে অর্থপাচারসংক্রান্ত তদন্ত চলার খবরও প্রকাশ্যে এসেছে। বিদেশে অবস্থানকালে এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। দেশে ফেরার পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
তবে দেউবার সমর্থকদের কাছে তার প্রত্যাবর্তন নেপালি কংগ্রেসের জন্য নতুন সম্ভাবনার বার্তা। তাদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে দেউবা দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারেন।
সব মিলিয়ে শের বাহাদুর দেউবার দেশে ফেরার পর নেপালি কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিকে গগন থাপার নেতৃত্ব ধরে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে দেউবাকে সামনে রেখে দলীয় ঐক্যের উদ্যোগ—এই দুই ধারার সংঘাত এখন ১৫তম সাধারণ সম্মেলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
সুপ্রিম কোর্টের পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত এবং দলীয় সম্মেলনের প্রস্তুতি কোন দিকে যায়, তার ওপরই নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বের পরবর্তী চিত্র অনেকটাই নির্ভর করছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন