চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ কয়েক দিনের স্বস্তির পর চট্টগ্রামে আবারও তীব্র হয়েছে গ্যাস সংকট। চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। কোথাও কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে, কোথাও মেশিন বন্ধ রাখতে হয়েছে। অন্যদিকে নগরের সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস নিতে দীর্ঘ সারি তৈরি হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন চালক ও যাত্রীরা।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে স্বাভাবিক সময়ে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ নেমে এসেছে চাহিদার প্রায় ৫২ দশমিক ৫ শতাংশে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বড় ধরনের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
গ্যাসের স্বল্পচাপ ও সরবরাহ ঘাটতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানায়। চট্টগ্রামের গ্যাসনির্ভর শিল্পে উৎপাদন কমে গেছে। পোশাক ও ওয়াশিং, ইস্পাত, স্টিল স্ট্রাকচার, জাহাজভাঙা, টেক্সটাইল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
কেজিডিসিএল সূত্রের বরাত থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা (সিইউএফএল)সহ বিভিন্ন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাসের স্বল্পতার কারণে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অনেক কারখানায় নির্ধারিত সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন হচ্ছে।
ওয়াশিং শিল্পেও পরিস্থিতি নাজুক। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানার মেশিন পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন কমার পাশাপাশি রপ্তানি আদেশ সময়মতো পূরণ করা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, গ্যাস সংকটে শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে হচ্ছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। এতে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন, পণ্য সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও কমেছে। প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বাড়ার কথাও উঠে এসেছে।
ফলে শিল্প খাতকে একই সঙ্গে দুই ধরনের সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একদিকে সরাসরি গ্যাসের অভাবে কারখানার উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে উৎপাদন কার্যক্রম আরও ব্যাহত হচ্ছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজিচালিত যানবাহনেও। নগরের বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। অনেক চালককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করতে হচ্ছে।
এর ফলে চালকদের কর্মঘণ্টার বড় অংশ ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষা করেই চলে যাচ্ছে। সময়মতো যানবাহন চলাচল করতে না পারায় যাত্রীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
শিল্প ও পরিবহনের পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকরাও গ্যাস সংকটে পড়েছেন। নগরের বিভিন্ন এলাকায় চুলায় স্বাভাবিক চাপ না থাকায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও দিনের বড় সময় গ্যাসের চাপ খুব কম থাকছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে একই সময়ে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহক—সব পর্যায়েই গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রামের বর্তমান গ্যাস সংকটের পেছনে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সমস্যার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত ২১ জুলাই মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির পর জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহে।
পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালের একটি বয়লার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং আংশিকভাবে গ্যাস সরবরাহও শুরু হয়। কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, টার্মিনালের মেরামতকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং সরবরাহ বাড়লে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
তবে সর্বশেষ পরিস্থিতিতে বৈরী আবহাওয়ার কারণে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে নতুন করে জাহাজ ভিড়তে না পারার বিষয়টিও সামনে এসেছে। এতে গ্যাস সরবরাহে আবার চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
এর আগে জুলাইয়ের শেষ দিকেও চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ কমে ২২ থেকে ২৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছিল বলে কেজিডিসিএলের এক কর্মকর্তার বরাতে জানা যায়। তখনও শিল্প ও ক্যাপটিভ পাওয়ারে গ্যাসের চাপ কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
এখন নতুন করে সংকট তীব্র হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা না গেলে শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পরিবহন খাতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বন্দরনির্ভর অঞ্চল হওয়ায় গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; রপ্তানি, উৎপাদন, পরিবহন ও সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যেও চাপ বাড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের সমস্যার দ্রুত সমাধান করে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে ধীরে ধীরে বর্তমান সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন