নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় (CBU) সর্বোচ্চ ৩৭৫ সিসি ইঞ্জিনক্ষমতার মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ দিয়েছে সরকার। নতুন ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯’-এ মোটরসাইকেল আমদানির সর্বোচ্চ ইঞ্জিনক্ষমতার সীমা বাড়ানো হয়েছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করে।
নতুন নীতির ফলে আগে যেখানে ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেল সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় আমদানিতে বিধিনিষেধ ছিল, সেখানে এখন ১৬৫ সিসির বেশি থেকে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানি করা যাবে।
২০২১–২০২৪ সালের আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী, সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেল আমদানিতে বিধিনিষেধ ছিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত অনেক মাঝারি ও উচ্চক্ষমতার মোটরসাইকেল সরাসরি বাংলাদেশে আমদানির সুযোগ সীমিত ছিল।
তবে দেশে উৎপাদনের ক্ষেত্রে উচ্চতর সিসির মোটরসাইকেলের সুযোগ আগে থেকেই ছিল। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দেশে উৎপাদিত ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল নিবন্ধনের অনুমতি দেয়। অর্থাৎ এতদিন ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত বাইক দেশে তৈরি করে নিবন্ধন করা গেলেও সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় একই শ্রেণির বাইক আমদানিতে সীমাবদ্ধতা ছিল।
২০২৬–২০২৯ মেয়াদের নতুন আমদানি নীতিতে সেই সীমাবদ্ধতা শিথিল করা হয়েছে। ফলে এখন বিদেশ থেকে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আনার সুযোগ তৈরি হলো। এতে দেশের বাজারে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের নতুন মডেল প্রবেশের সম্ভাবনা বাড়বে এবং ক্রেতাদের সামনে মোটরসাইকেলের বিকল্পও বাড়তে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ৩৭৫ সিসির বেশি সব ধরনের মোটরসাইকেল আমদানি করা যাবে। প্রস্তাবিত নীতির আলোচনাতেও ৩৭৫ সিসির ওপরে মোটরসাইকেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ ছিল; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনসাপেক্ষে আলাদা বিধান থাকার কথা বলা হয়েছিল।
নীতির এই পরিবর্তনে বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব বিদেশি ব্র্যান্ডের ২০০ থেকে ৩৭৫ সিসি শ্রেণির মডেল রয়েছে, তারা স্থানীয় পরিবেশক বা আমদানিকারকের মাধ্যমে এসব মডেল বাজারজাত করার সুযোগ পেতে পারে।
ক্রেতাদের জন্য এর সম্ভাব্য সুবিধা হলো—একই শ্রেণিতে আরও বেশি মডেল, ব্র্যান্ড ও প্রযুক্তির বিকল্প পাওয়া। তবে আমদানি শুল্ক, কর, নিবন্ধন ও অন্যান্য সরকারি ফি মিলিয়ে এসব মোটরসাইকেলের চূড়ান্ত বাজারদাম কত হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট আমদানি ও কর কাঠামোর ওপর।
নীতির পরিবর্তনকে ঘিরে দেশীয় মোটরসাইকেল উৎপাদনকারীদের প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। এর আগে উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে শিল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা যায়।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে খাতসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, সম্পূর্ণ তৈরি মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ বাড়লে দেশে কারখানা স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি তৈরি বাইকের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় পড়তে পারে। তাদের যুক্তি ছিল, দেশে উৎপাদনের পরিবর্তে তৈরি বাইক আমদানি বাড়লে স্থানীয় মূল্য সংযোজন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কমতে পারে।
অন্যদিকে আমদানির সুযোগ বাড়লে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি নতুন ব্র্যান্ড ও মডেল আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ফলে ভোক্তাদের পছন্দের পরিসরও বিস্তৃত হতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নতুন আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯ আগামী চার বছরের আমদানি কাঠামো নির্ধারণ করছে। মোটরসাইকেলের সিসি সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন নীতিতে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা গ্রহণ এবং শিল্প ও বিনিয়োগে বিভিন্ন সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়ও রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত সম্পূর্ণ তৈরি মোটরসাইকেল আমদানির অনুমতি বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বাজারে একটি উল্লেখযোগ্য নীতিগত পরিবর্তন। এখন এর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে আমদানিকারকদের কার্যক্রম, কর-শুল্ক কাঠামো, বাজারদর এবং দেশীয় উৎপাদনকারীদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন