প্রযুক্তি ডেস্ক: জ্বালানি ছাড়াই শুধুমাত্র সূর্যের আলোকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে পৃথিবী প্রদক্ষিণ—একসময় যা ছিল কল্পবিজ্ঞান, সেটিকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে সুইজারল্যান্ডের তৈরি সৌরচালিত বিমান Solar Impulse 2। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মানবচালিত সৌরবিমান হিসেবে পরিচিত এই বিমান নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
Solar Impulse প্রকল্পের নেতৃত্ব দেন সুইস অভিযাত্রী ও পাইলট Bertrand Piccard এবং প্রকৌশলী ও পাইলট André Borschberg। দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছরের গবেষণা, নকশা ও উন্নয়নের পর ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো আকাশে উড়ে Solar Impulse 2। বিমানটির ডানার বিস্তার প্রায় ৭২ মিটার, যা একটি বড় যাত্রীবাহী বিমানের সমতুল্য হলেও এর ওজন মাত্র প্রায় ২.৩ টন। এই বিশাল ডানাজুড়ে বসানো হয়েছে ১৭,২০০টিরও বেশি সৌর সেল, যা সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চারটি বৈদ্যুতিক মোটর চালায়। দিনে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে জমা থাকে, ফলে রাতেও বিমানটি নিরবচ্ছিন্নভাবে উড়তে পারে।
বিমানটি ২০১৫ সালের ৯ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি থেকে বিশ্বভ্রমণে যাত্রা শুরু করে। বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশ অতিক্রম করে ১৭টি ধাপে প্রায় ৪৩ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ উড়ে ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই আবার আবুধাবিতে ফিরে আসে। এর মাধ্যমে এটি বিশ্বের প্রথম মানবচালিত সৌরচালিত বিমান হিসেবে কোনো ধরনের জ্বালানি ব্যবহার ছাড়াই পৃথিবী প্রদক্ষিণের ইতিহাস গড়ে।
এই অভিযানের সময় বিমানটি একাধিক বিশ্বরেকর্ডও গড়ে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল টানা প্রায় ১১৭ ঘণ্টা (প্রায় পাঁচ দিন পাঁচ রাত) এককভাবে আকাশে উড্ডয়ন, যা বৈমানিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ একক ফ্লাইট হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, Solar Impulse 2 বর্তমানে বাণিজ্যিক যাত্রী পরিবহনের জন্য নয়; বরং এটি একটি প্রযুক্তিগত প্রদর্শনী, যার লক্ষ্য ছিল পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা। প্রকল্পটি দেখিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতের বিমান প্রযুক্তি আরও পরিবেশবান্ধব ও কার্বন নিঃসরণমুক্ত হতে পারে।
বর্তমানে সৌরচালিত ও বিকল্প জ্বালানিনির্ভর উড়োজাহাজ প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। Solar Impulse 2-এর ঐতিহাসিক সাফল্য সেই গবেষণাকে আরও গতি দিয়েছে এবং টেকসই বিমান চলাচলের ভবিষ্যৎ নির্মাণে এটি একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন