‘পেছনে পুলিশ, সামনে স্বাধীনতা’—একটি স্লোগান, একটি জাতির—সাহসের প্রতিচ্ছবি।

সাহসী কন্ঠস্বর
বিশেষ প্রতিনিধি 
 ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলোকে শুধু ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সেই মুহূর্তগুলো মানুষের সাহস, আত্মত্যাগ ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকে। বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল তেমনই এক অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ের অন্যতম স্মরণীয় উচ্চারণ—“পেছনে পুলিশ, সামনে স্বাধীনতা।”

জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং শহরের রাজপথ পরিণত হয়েছিল আন্দোলনের মঞ্চে। শুরুতে বৈষম্যবিরোধী দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হলেও দ্রুত তা বিস্তৃত হয়ে নাগরিক অধিকার, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে গণ-আন্দোলনের রূপ নেয়। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, বরিশাল, সিলেট, কুমিল্লা, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজারো মানুষ রাজপথে নেমে আসেন।

প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সংঘর্ষের খবর আসছিল। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট ও লাঠিচার্জের অভিযোগ ওঠে। অনেক স্থানে গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালিত হয়। কারফিউ জারি, ইন্টারনেট সেবা সীমিত বা বন্ধ থাকা এবং জনজীবনে অচলাবস্থার মধ্যেও আন্দোলনকারীরা পিছিয়ে যাননি।

এমন এক সময়ে রাজপথে ধ্বনিত হতে থাকে—“পেছনে পুলিশ, সামনে স্বাধীনতা।” এটি কেবল একটি স্লোগান ছিল না; বরং ভয়কে অতিক্রম করে লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ছিল। পুলিশের উপস্থিতি কিংবা গ্রেপ্তারের আশঙ্কা আন্দোলনকারীদের থামাতে পারেনি। তাদের বিশ্বাস ছিল, ন্যায্য দাবির সংগ্রামে সাহসই সবচেয়ে বড় শক্তি।

আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অনেক জায়গায় পুলিশি বাধার মুখেও শিক্ষার্থীরা একে অপরের হাত ধরে সামনে এগিয়ে যান। কেউ আহত হন, কেউ আটক হন, আবার অনেক পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারানোর শোক বহন করে। সেই ত্যাগ ও সাহস আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্তকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই স্লোগান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য ছবি, ভিডিও ও পোস্টে এটি আন্দোলনের প্রতীকী ভাষায় পরিণত হয়। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বাংলাদেশের আন্দোলনের নানা চিত্র প্রকাশিত হয়, যেখানে মানুষের সাহস ও দৃঢ়তার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে।

ইতিহাস বলে, বড় গণআন্দোলনের পরিচয় শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনে নয়; মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকা কিছু শব্দ, কিছু স্লোগানেও। যেমন ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ১৯৯০-এর গণআন্দোলনের কিছু উচ্চারণ আজও ইতিহাসের অংশ। তেমনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি আলোচনা হলেই “পেছনে পুলিশ, সামনে স্বাধীনতা” স্লোগানটি বারবার ফিরে আসে।

আজ ফিরে তাকালে বোঝা যায়, এটি ছিল শুধু একটি বাক্য নয়; এটি ছিল সাহসের ভাষা, প্রতিবাদের ভাষা এবং ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাসের ভাষা। ভয়কে জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার যে মানসিক শক্তি এই স্লোগান মানুষকে দিয়েছিল, সেটিই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম স্থায়ী স্মারক হয়ে থাকবে।

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post a Comment (0)

নবীনতর পূর্বতন