আকাশপথে ব্যক্তিগত যাতায়াতের নতুন যুগ! উড়ন্ত গাড়ি নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে জোর প্রস্তুতি।

উড়ন্ত গাড়ির প্রযুক্তি
প্রযুক্তি ডেস্ক
 সড়কের যানজট এড়িয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে আকাশপথে গন্তব্যে পৌঁছানোর স্বপ্ন আর কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনির পাতায় সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উড়ন্ত গাড়ি বা বৈদ্যুতিক এয়ার ট্যাক্সি তৈরির কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বিশ্বের কিছু শহরে সীমিত পরিসরে উড়ন্ত যান বাণিজ্যিকভাবে চালু হতে পারে, যা নগর পরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

বর্তমানে এই প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো eVTOL (Electric Vertical Take-Off and Landing)। এ ধরনের যানবাহন হেলিকপ্টারের মতো খাড়াভাবে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে, তবে এটি বৈদ্যুতিক মোটরে চলে এবং একাধিক প্রপেলারের সাহায্যে আকাশে ভেসে থাকে। ফলে জ্বালানিনির্ভর প্রচলিত উড়োজাহাজের তুলনায় শব্দ ও কার্বন নিঃসরণ উভয়ই কম।

উড়ন্ত গাড়ি প্রযুক্তির দৌড়ে বর্তমানে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর একটি চীন। দেশটির XPeng AeroHT এবং EHang ইতোমধ্যে একাধিক সফল পরীক্ষামূলক ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। বিশেষ করে XPeng এমন একটি যান তৈরি করছে, যেখানে একটি ছয় চাকার বৈদ্যুতিক গাড়ির ভেতরেই ছোট আকারের উড়ন্ত যান বহন করা যায়। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৭ সালের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রও এই প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। Joby Aviation, Archer Aviation এবং Beta Technologies-এর মতো প্রতিষ্ঠান যাত্রী পরিবহনের উপযোগী বৈদ্যুতিক এয়ার ট্যাক্সি তৈরি করছে। মার্কিন বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (FAA) এসব উড়ন্ত যানকে বাণিজ্যিক অনুমোদনের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। লক্ষ্য হলো বড় শহরগুলোতে বিমানবন্দর ও নগরকেন্দ্রের মধ্যে দ্রুত আকাশপথে যাত্রী পরিবহন চালু করা।

এশিয়ার আরেক প্রযুক্তিনির্ভর দেশ জাপানও পিছিয়ে নেই। SkyDrive নামের প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলক উড্ডয়নে সফল হয়েছে এবং ভবিষ্যতে শহরভিত্তিক আকাশ পরিবহন চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে জার্মানির Volocopter, যুক্তরাজ্যের Vertical Aerospace এবং নেদারল্যান্ডসের PAL-V-সহ ইউরোপের একাধিক প্রতিষ্ঠানও নতুন প্রজন্মের উড়ন্ত যান তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথম দিকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নয়; বরং এয়ার ট্যাক্সি, জরুরি চিকিৎসা সেবা, দুর্যোগে উদ্ধার অভিযান, নিরাপত্তা কার্যক্রম এবং বিমানবন্দর থেকে শহরে দ্রুত যাত্রী পরিবহনে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এতে সড়কের যানজট কমানোর পাশাপাশি সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে সাশ্রয় হবে।

তবে প্রযুক্তিটি এখনো কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আকাশপথে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, শক্তিশালী ব্যাটারি প্রযুক্তি, চার্জিং অবকাঠামো এবং উড্ডয়ন-অবতরণের জন্য বিশেষ "ভার্টিপোর্ট" নির্মাণ ছাড়া ব্যাপকভাবে উড়ন্ত গাড়ি চালু করা সম্ভব নয়। এছাড়া প্রতিটি দেশের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনও একটি বড় বিষয়।

বিশ্বজুড়ে সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে ভবিষ্যতের নগর পরিবহন ব্যবস্থায় উড়ন্ত গাড়িকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে নিয়মিত এয়ার ট্যাক্সি সেবা চালু হবে। আর প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উৎপাদন ব্যয় কমে এলে একসময় ব্যক্তিগত উড়ন্ত গাড়িও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসতে পারে। তখন শহরের ব্যস্ত সড়কের পরিবর্তে আকাশপথই হয়ে উঠতে পারে দ্রুত ও আধুনিক যাতায়াতের নতুন ঠিকানা।

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post a Comment (0)

নবীনতর পূর্বতন