প্রগতি বার্তা
সর্বশেষ সংবাদ লোড হচ্ছে...

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বাংলাদেশকে ৩০ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক, উপকৃত হবে ২ কোটি ৬০ লাখ শিশু।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ৩০ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক, উপকৃত হবে ২ কোটি ৬০ লাখ শিশু।

প্রগতি বার্তা | শিক্ষা ডেস্ক

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, শিশুদের শিখন ঘাটতি পূরণ এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে ৩০ কোটি (৩০০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। এ অর্থায়নের আওতায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত দেশের প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ শিশুর শিক্ষার মানোন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।

বিশেষ করে শিশুদের মৌলিক সাক্ষরতা, পড়ার দক্ষতা, লেখার সক্ষমতা এবং গণিতের ভিত্তিগত জ্ঞান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত পাঠদান ও বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, প্রধান শিক্ষকদের নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের মান উন্নয়নও এই কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ‘লার্নিং এনহ্যান্সমেন্ট অ্যান্ড অ্যাক্সিলারেশন ইন প্রাইমারি এডুকেশন’ (LEAP) কর্মসূচির আওতায় এ অর্থায়নের অনুমোদন দেয়। শনিবার (৭ নভেম্বর) বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

বিশ্বব্যাংকের  বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) বাস্তবায়নে সহায়তা করবে এই অর্থ। এর মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের শিখনফল বাড়ানো এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করা হবে।

বিশ্বব্যাংকের নতুন কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো প্রাথমিক স্তরেই শিশুদের শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী করা। কারণ, এই পর্যায়ে পড়া, লেখা ও গণিতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে না পারলে পরবর্তী শ্রেণিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়।

এ লক্ষ্য অর্জনে বিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ শিখন প্যাকেজ চালু করা হবে। এর মধ্যে থাকবে মানসম্মত শিক্ষা উপকরণ, নির্ধারিত পাঠ পরিকল্পনা, শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ।

শিক্ষার্থীরা যাতে শুধু পাঠ্যবই মুখস্থ না করে বিষয়বস্তু বুঝে পড়তে, নিজের ভাষায় লিখতে এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় গাণিতিক হিসাব করতে পারে, সে ধরনের শিক্ষণ পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

পাশাপাশি প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার মান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে শিশুরা বিদ্যালয়ে প্রবেশের আগেই প্রাথমিক শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও শেখার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

দেশের সব শিক্ষার্থী একই গতিতে শিখতে পারে না। বিভিন্ন কারণে অনেক শিশু নির্ধারিত শ্রেণির উপযোগী পড়া, লেখা ও গণিতের দক্ষতা অর্জন করতে পিছিয়ে পড়ে। এসব শিক্ষার্থীর শিখন ঘাটতি পূরণে বিশেষ সহায়তা দেওয়া হবে।

কর্মসূচির আওতায় অতিরিক্ত পাঠদান বা প্রতিকারমূলক শিখন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষ করে যেসব জেলার শিক্ষার্থীরা শিখনফলে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে, সেসব এলাকায় বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষার মানের ব্যবধান কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।

শিক্ষার মান উন্নয়নে শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, শিক্ষকদের দক্ষতা এবং বিদ্যালয় পরিচালনার ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে বিশ্বব্যাংক।

নতুন কর্মসূচির আওতায় দেশের ৯০ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষকদের কাজের সমন্বয়, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি মূল্যায়নে প্রধান শিক্ষকদের সক্ষমতা বাড়ানো হবে।

এ ছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকবে। যাতে তাঁরা আরও পরিকল্পিত ও কার্যকরভাবে শিশুদের পড়া, লেখা ও গণিত শেখাতে পারেন।

শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র

বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হলেও শিক্ষার গুণগত মান এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১০ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৫০ শতাংশ বয়স ও শ্রেণি উপযোগী একটি সাধারণ লেখা পড়ে তার অর্থ বুঝতে পারে না।

তুলনামূলকভাবে মালয়েশিয়ায় এ হার ৪২ শতাংশ এবং ব্রাজিলে ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু প্রয়োজনীয় মৌলিক শিখন দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।

বিশ্বব্যাংকের মতে, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা একটি দক্ষ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম কর্মশক্তি গড়ে তোলার ভিত্তি। তাই শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি তারা প্রকৃত অর্থে কতটুকু শিখছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও তথ্যের ব্যবহার বাড়বে

কর্মসূচির আওতায় শুধু পাঠদান পদ্ধতির উন্নয়ন নয়, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হবে।

বিদ্যালয় পরিচালনা, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষা খাতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্ভরযোগ্য তথ্য ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়িয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও কর্মসূচির দলনেতা তাসমিনা রহমানের মতে, ভবিষ্যতে ভালো কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের প্রথম ধাপ হলো শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী করা। কোনো শিশু যাতে শিখন প্রক্রিয়ায় পিছিয়ে না থাকে, সে লক্ষ্যেই বিশেষ সহায়তা ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

২৫ বছরের ঋণ, প্রথম পাঁচ বছর পরিশোধে ছাড়

বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) থেকে এই ৩০ কোটি ডলারের অর্থায়ন দেওয়া হচ্ছে। আইডিএ স্বল্প আয়ের ও যোগ্য দেশগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ ও অনুদান দিয়ে থাকে।

ঋণটির মেয়াদ ২৫ বছর। এর মধ্যে প্রথম পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড বা ঋণ পরিশোধে ছাড়ের সময় হিসেবে নির্ধারিত রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষায় বড় কর্মসূচি পিইডিপি-৫

এর আগে গত ৪ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৪১ হাজার ৯০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

পিইডিপি-৫-এর আওতায় বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এর ব্যয় ও বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কিছু পর্যবেক্ষণ থাকায় সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ৩০ কোটি ডলারের অর্থায়ন পিইডিপি-৫ বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। তবে এটি পুরো পিইডিপি-৫-এর মোট ব্যয় নয়; বরং বৃহত্তর কর্মসূচির একটি নির্দিষ্ট অর্থায়ন অংশ।

সব মিলিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের এ অর্থায়ন দেশের বিপুলসংখ্যক শিশুর মৌলিক শিখন দক্ষতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এ কর্মসূচির প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে অর্থের যথাযথ ব্যবহার, প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা এবং বিদ্যালয় পর্যায়ে পরিকল্পনাগুলোর সফল বাস্তবায়নের ওপর।

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post a Comment (0)

নবীনতর পূর্বতন

𝑷𝒓𝒐𝒈𝒂𝒕𝒊𝑩𝒂𝒓𝒕𝒂

প্রগতি বার্তা
সত্যের সন্ধানে নির্ভীক