আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেট নির্বাচনের প্রাথমিক ভোট গণনায় সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি। তবে দলটি এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টিও উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছে। ফলে নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক ভোট গণনায় লিকুদ পার্টি পেয়েছে ২১ দশমিক ৭০ শতাংশ ভোট। আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি পেয়েছে ১৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। আর ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে ৯ দশমিক ২২ শতাংশ ভোট।
তবে এসব পরিসংখ্যান আংশিক ভোট গণনার ফল। গণনা শেষ হওয়ার আগে ভোটের হার ও আসনসংখ্যায় পরিবর্তন আসতে পারে। তাই প্রাথমিক ফলের ভিত্তিতে কোনো দল বা জোটের জয় নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসন ১২০টি। দেশটিতে সরকার গঠন করতে সাধারণত অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন। নির্বাচনে কোনো একটি দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে বিভিন্ন দলের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জোট সরকার গঠন করতে হয়।
নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি একক দল হিসেবে এগিয়ে থাকলেও তার নেতৃত্বাধীন পুরো জোট কতটি আসন পাবে, সেটিই সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরকেও প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের এক্সিট পোলেও দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে কাছাকাছি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এসব পূর্বাভাসে কোনো পক্ষই নিশ্চিতভাবে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে—এমন চিত্র উঠে আসেনি।
দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা নেতানিয়াহুর জন্য এবারের নির্বাচন ছিল নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলা এবং এরপর গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি ব্যাপক আলোচনায় রয়েছে।
সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট এবার ইয়াশার পার্টির নেতৃত্ব দিয়ে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে প্রধান রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ গড়ে তুলেছেন। নির্বাচনী প্রচারে নেতৃত্ব, নিরাপত্তা এবং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
প্রাথমিক ফলাফলে লিকুদ এগিয়ে থাকলেও ইয়াশার পার্টির ভোটের হার বিরোধী শিবিরের অবস্থান মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি দলের ভোটের হার দিয়ে পুরো রাজনৈতিক জোটের আসনসংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না।
প্রাথমিক ভোট গণনায় জয়েন্ট লিস্টের ৯ দশমিক ২২ শতাংশ ভোট পাওয়া নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত অবস্থান সরকার গঠনের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
যদি নেতানিয়াহুর জোট ও আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির—কোনো পক্ষই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারে, তাহলে ছোট দলগুলোর সমর্থন আদায়ের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে আরব দলগুলো কোন পক্ষকে সমর্থন করবে, তারা সরকারে অংশ নেবে কি না এবং তাদের সঙ্গে অন্য দলগুলোর সমঝোতা কতটা সম্ভব হবে—এসব বিষয় এখনো রাজনৈতিক আলোচনার ওপর নির্ভর করছে।
ভোটার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। ১৯৯৯ সালের পর এটি দেশটির সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি বলে জানিয়েছে নির্বাচন কর্তৃপক্ষ।
উচ্চ ভোটার উপস্থিতি নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সমর্থকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের চিত্র তুলে ধরেছে। তবে ভোটার উপস্থিতি বেশি হলেই কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
নির্বাচন কমিশনের ভোট গণনা ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হবে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের নির্ধারিত তারিখ ৪ নভেম্বর।
চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এরপর সরকার গঠনের জন্য উপযুক্ত প্রার্থীকে দায়িত্ব দেওয়ার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এগোবে। মনোনীত প্রার্থীকে সরকার গঠনের জন্য সর্বোচ্চ ৪২ দিন সময় দেওয়া হতে পারে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো প্রার্থী সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে দেশটিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে পারেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী নতুন নির্বাচনের পথও তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইসরাইলের নির্বাচনে লিকুদ পার্টি প্রাথমিক ভোট গণনায় এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের চূড়ান্ত সমীকরণ এখনো পরিষ্কার নয়। ভোট গণনা, আসন বণ্টন এবং বিভিন্ন দলের মধ্যে সমঝোতার ওপর নির্ভর করছে দেশটির পরবর্তী সরকারের ভবিষ্যৎ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন