সম্পাদকীয়। প্রগতিবার্তা
মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের স্বাধীনতার জন্য মাত্র ১৮ বছর বয়সে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমান। ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্ত ফাঁড়ি দখলের যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর মেশিনগান পোস্ট অকার্যকর করতে গিয়ে শহীদ হন তিনি। তাঁর অসামান্য সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
আজ বুধবার (২৮ অক্টোবর) বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯৭১ সালের এই দিনে দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করা এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে জাতি।
বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমান ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন যশোর জেলার বর্তমান ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম আক্কাস আলী মণ্ডল এবং মায়ের নাম কায়মুন্নেসা। সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা হামিদুর রহমান অল্প বয়সেই সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য হিসেবে যুদ্ধের বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেন। দেশকে শত্রুমুক্ত করার প্রত্যয় নিয়ে তিনি সম্মুখযুদ্ধে সাহসিকতার পরিচয় দেন।
১৯৭১ সালের অক্টোবরের শেষদিকে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র লড়াই চলছিল। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সীমান্ত ফাঁড়ি দখল করা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম লক্ষ্য।
২৮ অক্টোবর ভোররাতে লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের নেতৃত্বে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সি কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধারা ধলই সীমান্ত ফাঁড়ি দখলের অভিযান শুরু করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এ অভিযানে প্রায় ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা অংশ নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
অভিযানের একপর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি মেশিনগান পোস্ট থেকে অবিরাম গুলিবর্ষণের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। শত্রুপক্ষের ওই অবস্থান অকার্যকর করা জরুরি হয়ে পড়ে। এ সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে যান তরুণ সিপাহি হামিদুর রহমান।
সহযোদ্ধাদের জীবন রক্ষায় শত্রুর বাঙ্কার ধ্বংস করতে গিয়ে মেশিনগানের গুলিতে শহীদ হন তিনি। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, হামিদুর রহমান গ্রেনেড নিক্ষেপ করে মেশিনগান পোস্টটি অকার্যকর করতে সক্ষম হন। তাঁর এই সাহসী পদক্ষেপে মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম হয়।
তবে সেই অভিযানে বিজয়ের মুহূর্তটি দেখে যেতে পারেননি এই তরুণ মুক্তিযোদ্ধা। দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ হামিদুর রহমানকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করা হয়। তিনি বাংলাদেশের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে তাঁর এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, দেশের স্বাধীনতার জন্য বয়স কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তাঁর সাহসিকতা ও দেশপ্রেম পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
ধলই সীমান্তের যুদ্ধে শহীদ হওয়ার পর হামিদুর রহমানের মরদেহ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আমবাসা এলাকার হাতিমেরছড়া গ্রামে দাফন করা হয়। দীর্ঘদিন তাঁর দেহাবশেষ সেখানেই ছিল।
স্বাধীনতার ৩৬ বছর পর ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর তাঁর দেহাবশেষ ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরদিন ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে পুনঃসমাহিত করা হয়।
তাঁর দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনা ছিল জাতির এই বীর সন্তানকে যথাযথ মর্যাদায় স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্ত এলাকায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিতে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিসৌধ। চা-বাগানঘেরা এই এলাকায় তাঁর বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের ইতিহাস সংরক্ষণে গড়ে তোলা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমান জাদুঘর।
প্রতিবছর ২৮ অক্টোবর তাঁর শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে স্থানীয় প্রশাসন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশের মুক্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করা এই বীরের সাহসিকতা ও দেশপ্রেম আজও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।
স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ও সার্বভৌমত্বের পেছনে রয়েছে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার ত্যাগ ও রক্তের ইতিহাস। তাঁদেরই একজন হামিদুর রহমান, যিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে জীবন দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ বীরত্বের স্বীকৃতি অর্জন করেন।
তাঁর ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে এই বীর সন্তানকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর নাম ও অবদান চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন