ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টহল পয়েন্টে প্রবেশে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে সীমান্তের কাছে ভারতীয়দের ঐতিহ্যগত চারণ ও শিকার এলাকায় চীনা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
অরুণাচল প্রদেশের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পিপলস পার্টি অব অরুণাচল (PPA)-এর একটি চার সদস্যের তথ্য-অনুসন্ধানী কমিটি সরেজমিন পরিদর্শনের পর এসব দাবি করেছে।
PPA-র তথ্য-অনুসন্ধানী কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টাকসিং এলাকায় লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (LAC)-এর কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টহল পয়েন্ট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে শেরা-৫ (Shera 5) নামের একটি টহল পয়েন্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিটির দাবি, ২০২৩ সালে ওই এলাকায় ভারতীয় ও চীনা বাহিনীর মধ্যে মুখোমুখি অবস্থানের পর ভারতীয় বাহিনী সেখান থেকে সরে যায়। এরপর ভারতীয় বাহিনী ওই নির্দিষ্ট পয়েন্টে আর নিয়মিতভাবে ফিরে যেতে পারেনি বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছে কমিটি।
PPA-র প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, পরে চীনা বাহিনী ওই এলাকায় থাকা ভারতীয় পক্ষের কিছু চিহ্ন সরিয়ে দেয়। ফলে ওই টহল পয়েন্টে ভারতীয় বাহিনীর প্রবেশ কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তথ্য-অনুসন্ধানী দলের আরেকটি দাবি হলো, টাকসিং এলাকার LAC-সংলগ্ন ঐতিহ্যগত ভারতীয় চারণ ও শিকার এলাকায় চীনা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে বাড়ছে।
কমিটি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে সীমান্ত এলাকায় ভারতের নজরদারি ও অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
PPA-র চার সদস্যের তথ্য-অনুসন্ধানী দলটি ১০ জুলাই টাকসিং সফর করে। দলের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ও PPA-র প্রধান উপদেষ্টা কাহফা বেঙ্গিয়া। অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট কালিং জেরাং এবং দলীয় নেতা সরং কিওকাম ও নারাহ জিমি।
দলটি টাকসিং ছাড়াও মাজা ও গালেমো এলাকার স্থানীয় নেতা, প্রবীণ ব্যক্তি ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে। পাশাপাশি সেখানে দায়িত্ব পালনরত প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা করে।
তবে PPA-র এসব অভিযোগকে ভারতীয় সেনাবাহিনী স্বীকার করেনি। ভারতীয় সামরিক সূত্র চীনা বাহিনীর নতুন করে ভারতীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ বা সেখানে ক্যাম্প স্থাপনের খবরকে ভিত্তিহীন ও ভুল বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডুও টাকসিং এলাকায় চীনা অনুপ্রবেশের খবর অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অরুণাচল প্রদেশে চীনা বাহিনীর নতুন করে ভূখণ্ড দখলের কোনো লক্ষণ নেই এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী সীমান্তে কার্যকরভাবে টহল ও নিরাপত্তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ফলে বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে দুটি ভিন্ন দাবি সামনে রয়েছে—একদিকে PPA-র তথ্য-অনুসন্ধানী কমিটি চীনা বাহিনীর কারণে ভারতীয় টহল সীমিত হওয়ার অভিযোগ করেছে; অন্যদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও রাজ্য সরকার এসব অভিযোগের সত্যতা অস্বীকার করেছে।
অরুণাচল নিয়ে নতুন করে অভিযোগ সামনে আসার মধ্যেই ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্ত পরিস্থিতি দুই দেশের সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে। অর্থাৎ সীমান্তে উত্তেজনা বাড়লে ভারত-চীন সম্পর্কেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে চীন সীমান্ত পরিস্থিতিকে বর্তমানে “সাধারণভাবে স্থিতিশীল” বলে বর্ণনা করেছে। সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে ভারত ও চীনের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ রয়েছে। চীন রাজ্যটির ওপর নিজেদের দাবি করে আসছে। ভারত বরাবরই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে অরুণাচল প্রদেশকে দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে।
অরুণাচল প্রদেশের টাকসিং এলাকা ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গম এই সীমান্ত এলাকায় যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে ভারত।
২০২০ সালে লাদাখে ভারত ও চীনা সেনাদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর দুই দেশের সীমান্ত সম্পর্ক দীর্ঘ সময় উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। পরবর্তী সময়ে সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াও কিছুটা এগোয়।
এমন পরিস্থিতিতে অরুণাচলের টাকসিং এলাকায় নতুন করে চীনা বাহিনীর কার্যক্রমের অভিযোগ সামনে আসায় সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
PPA-র প্রতিবেদন প্রকাশের পর ভারতের রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আর কে সিং প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী কতগুলো টহল পয়েন্টে নিয়মিত যাতায়াত করতে পারছে না।
এদিকে অরুণাচল প্রদেশের স্থানীয় ছাত্র সংগঠনসহ বিভিন্ন পক্ষও পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে সীমান্ত এলাকায় চীনা কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ আরও প্রকাশ্যে এসেছে।
এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে চীনা বাহিনী অরুণাচল প্রদেশের নতুন কোনো ভারতীয় ভূখণ্ড দখল করেছে। এটি PPA-র তথ্য-অনুসন্ধানী কমিটির অভিযোগ, যা ভারতীয় সেনাবাহিনী ও সরকার প্রত্যাখ্যান করেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন