আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভয়াবহ দাবানলের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে ‘ফায়ার ক্লাউড’ বা আগুনজনিত মেঘ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি শুধু দাবানলের একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়; বরং এমন একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, যা নিজেই আগুনকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়া, নতুন এলাকায় দাবানল সৃষ্টি এবং উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গ্রিস, তুরস্ক, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল এবং বলকান অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও হাজার হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে, শত শত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে বিমান, হেলিকপ্টার ও হাজারো দমকলকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। দাবানলের তীব্রতার মধ্যেই কয়েকটি এলাকায় আকাশে বিশাল ধোঁয়ার স্তম্ভ ও আগুনজনিত মেঘ তৈরি হওয়ার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছেন আবহাওয়াবিদরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন কোনো দাবানল অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করে, তখন আগুন থেকে নির্গত প্রচণ্ড তাপ ধোঁয়া, ছাই, গ্যাস ও জলীয় বাষ্পকে দ্রুত কয়েক কিলোমিটার উঁচুতে তুলে নিয়ে যায়। এসব উপাদান ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে এসে বড় আকারের মেঘ তৈরি করে। এ ধরনের মেঘকে পাইরোকিউমুলাস (Pyrocumulus) বলা হয়। যদি এটি আরও শক্তিশালী হয়ে বজ্রগর্ভ মেঘে পরিণত হয়, তখন তাকে পাইরোকিউমুলোনিম্বাস (Pyrocumulonimbus) বলা হয়, যা সাধারণভাবে ‘ফায়ার ক্লাউড’ নামে পরিচিত।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ফায়ার ক্লাউড তৈরি হলে এটি অনেক সময় নিজস্ব আবহাওয়া ব্যবস্থা তৈরি করে। এর ফলে শক্তিশালী ও অনিয়ন্ত্রিত দমকা হাওয়া সৃষ্টি হয়, যা আগুনকে মুহূর্তেই নতুন এলাকায় ছড়িয়ে দিতে পারে। আবার এই মেঘ থেকে বজ্রপাতের ঘটনাও ঘটতে পারে। যদি সেই বজ্রপাত শুষ্ক বনাঞ্চল বা তৃণভূমিতে আঘাত হানে, তাহলে নতুন করে আরও দাবানল শুরু হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, ফায়ার ক্লাউড থেকে সৃষ্ট বাতাসের দিক ও গতিবেগ দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। এতে আগুনের গতিপথও হঠাৎ বদলে যায়, যা দমকলকর্মী ও উদ্ধারকারী দলের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে আগুন নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাও অল্প সময়ের মধ্যে আবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে পারে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, কম বৃষ্টিপাত এবং খরার প্রবণতা বেড়েছে। এসব কারণে বনাঞ্চল অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে পড়ছে এবং সামান্য আগুনও দ্রুত বড় দাবানলে রূপ নিচ্ছে। এর সঙ্গে তীব্র তাপমাত্রা যুক্ত হওয়ায় ফায়ার ক্লাউড তৈরির মতো ঘটনা আগের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও ঘন ঘন বড় দাবানল এবং ফায়ার ক্লাউডের মতো চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা দেখা যেতে পারে। তাই শুধু আগুন নেভানো নয়, বন সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছেন তারা।
বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আগুন নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, পাশাপাশি আকাশ ও স্থলপথে সমন্বিতভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে আবহাওয়া অনুকূলে না এলে এবং তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন